মাদকাসক্তির অপকারিতা ও প্রতিকার রচনা

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ সরকার মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন। আর এই সময় মাদকাসক্তির অপকারিতা ও প্রতিকার রচনা গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু এই বিষয়ে মানুষের বেশ কিছু ঘটনা দেখা দিয়েছে সেক্ষেত্রে এই মাদকাসক্তির অপকারিতা ও প্রতিকার রচনাটি আসতে পারে। আপনি যদি সহজ ভাষায় মাদকাসক্তির অপকারিতা ও প্রতিকার রচনা খুঁজে থাকেন এই আর্টিকেলটি আপনার জন্য।
মাদকাসক্তি-ও-তার-প্রতিকার-রচনা
আপনার যদি বই না থাকে বা আপনি যদি বাইরে কোথাও থাকেন আর এমন সময় এই রচনাটি পড়তে চান তাহলে আপনি সঠিক আর্টিকেলটি পড়ছেন।
সূচিপত্র

মাদকাসক্তি ও তার প্রতিকার রচনা

বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৮২ লাখেরও বেশি যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮৮ শতাংশ মাদক সেবন করে। ছাড়া পুরো বিশ্বের মধ্যে প্রায় ৩১ কোটি ৬০ লক্ষরও বেশি মানুষ মাদক সেবন করে। বর্তমান সময়ে খুবই আলোচিত একটি বিষয়।

আমরা এই আর্টিকেল দিয়ে এমন সকল তথ্য দিয়ে সাজিয়েছি যেখানে আপডেট তথ্য আছে আর যে তথ্যগুলো আপনার রচনায় যুক্ত করলে আপনার রচনাটি অন্যদের থেকে আলাদা হবে আর আপনি পরীক্ষার খাতায় বেশি নাম্বার পেতে পারেন।

চলুন তাহলে আমরা আর দেরি না করে মাদকাসক্তির অপকারিতা ও প্রতিকার রচনা লিখি। তবে এটি পরীক্ষার খাতায় বিভিন্নভাবে আসতে পারে যেমন মাদকাসক্তি ও তার প্রতিকার রচনা, মাদকাসক্তি অপকারিতা ও প্রতিকার রচনা, এছাড়াও সর্বনাশ মাদকাসক্তি বা মাদকাসক্তির পরিণাম ও প্রতিকার যেকোন ভাবে আসতে পারে আপনি নিচের এই রচনাটি লিখলেই হবে।
মাদকাসক্তি-ও-তার-প্রতিকার-রচনা

মাদকাসক্তির অপকারিতা ও প্রতিকার রচনা

ভূমিকা:

মাদক নামক সর্বনাশা নেশাদ্রব্যের করালগ্রাসে পৃথিবীর যুবসমাজ আজ ধ্বংসের মুখোমুখি। পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই যেখানে মাদক তার হিংস্র থাবা বসায়নি। আধুনিক বিজ্ঞান মাদকের উত্তরোত্তর উন্নতি ঘটিয়ে যুবসমাজের সামনে বিছিয়ে দিয়েছে মায়াজাল। মানবসমাজ আজ এমনই এক রূঢ়, নিষ্ঠুর সময়ের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধের বিজ্ঞান আজ জটিল থেকে জটিলতর।

জীবাণু-যুদ্ধ, রাসায়নিক যুদ্ধের পরে এবার নেশাযুদ্ধ। এ নেশাযুদ্ধ মাদকের। এ নেশাযুদ্ধের কবলে পড়েছে হাজার হাজার তরুণ, এমনি করেই চলেছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মৃতকল্প, অসার করে দেওয়ার এক বৃহৎ পরিকল্পনা। যুবশক্তিই দেশের প্রাণ। কিন্তু তারা নেশার ঘোরে ঢলে পড়ছে মৃত্যুর কোলে। দাবানলের মতো তা ছড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে, শহরতলীতে, গ্রাম-গ্রামান্তরে।

মাদকাসক্তির কারণ:

মাদকদ্রব্যের প্রতি মানুষের আসক্তি জন্মায় ধীরে ধীরে। একদিনে হঠাৎ করে এর প্রতি কেউ আসক্ত হয় না। মাদকাসন্তির পেছনে কতগুলো কারণ রয়েছে। যেমন:

ক. হতাশা: ব‍্যক্তিজীবনে হতাশা মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ। মানুষের জীবনে অনেক আশা থাকে। যখন এ আশা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় তখন সে নেশাজাতীয় দ্রব্যে আসক্ত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে যুবসমাজ মাদকাসক্ত বেশি হয়। কারণ তারা শিক্ষিত হওয়ার পর কর্মসংস্থানের অভাবে বেকার হয়ে পড়ে। ফলে তারা হতাশ হয় এবং নেশা করে হতাশা ভুলে থাকতে চায়।


খ. পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রভাব: মাদকাসক্তির জন্যে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ অনেকখানি দায়ী। যুবকেরা খারাপ সঙ্গে অর্থাৎ যারা মাদ্রকদ্রব্য সেবন করে তাদের সঙ্গে মিশে মাদকাসক্ত হয়।

গ . চিরন্তন নতুনত্বের নেশা বা কৌতূহল: তরুণ সমাজ অনেক সময় কৌতূহলবশত নতুন জিনিসের স্বাদ গ্রহণ করার জন্যে On Test হিসেবে এর সঙ্গে পরিচিত হয়, পরে আর এ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না।

মাদকদ্রব্যের প্রকারভেদ:

বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য ব্যবহৃত হয়। প্রাচীন কালের মাদকদ্রব্যের ভেতর রয়েছে মদ, ভাং, গাজা, আফিম ইত্যাদি। বর্তমানে নিত্যনতুন মাদকদ্রব্য আবিষ্কৃত হয়েছে। যেমন: হেরোইন, প্যাথেড্রিন, মারিজুয়ানা, কোকেন, হাসিস, মরফিন, পপি ইত্যাদি।

হেরোইন, কোকেন এবং পপি বেশি মূল্যাবান মাদকদ্রব্য। আমাদের দেশের যুবসমাজ সামান্য কারণেই যেসব ড্রাগ মাদকদ্রব্য হিসেবে ব্যবহার করে সেসব হলো- সিডাকসিন, মরফিন, ইনকডিন, প্যাথেড্রিন, ফেনসিডিল ইত্যাদি।

সম্প্রতি পূর্ব এশীয় দেশগুলো থেকে আসা ইয়াবা (ট্যাবলেট) নামক মাদকদ্রব্য আমাদের উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের মাঝে ব্যাপক হারে বিস্তৃতি লাভ করেছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মাদকদ্রব্যের ব্যবহার:

বাংলাদেশে মাদকদ্রব্যের ব্যবহার আশংকাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের যুবসমাজ আজ ভয়াবহভাবে মাদকদ্রব্যের শিকার। অবৈধ পথে আসা এসব মাদকদ্রব্য এদেশে বিক্রি হয় এবং ব্যবহৃত হয়। দেশের পরিণতি এজন্যে দিন দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। মাদকদ্রব্য সেবনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে যুবসমাজ বিভিন্ন সন্ত্রাসী ও বেআইনি কাজে লিপ্ত হচ্ছে।

ফলে সমাজ চলে যাচ্ছে ধ্বংসের দিকে। বাংলাদেশে মদ উৎপাদনকারী একমাত্র বৈধলাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান হলো দর্শনার 'কেরু এন্ড কোম্পানি'। এ ছাড়াও অবৈধভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন মাদকদ্রব্য তৈরি ও বিক্রি হচ্ছে। দেশের এ অবস্থা নিরসনের জন্যে অতি দ্রুত বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। ইতোমধ্যে সরকার এ ব্যাপারে অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

তবে সরকারের একার পক্ষে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়- এজন্যে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে মাদক সেবনের ভয়াবহতা রোধ করার বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

মাদকদ্রব্যের ব্যবহার:

প্রাচীন কাল থেকেই মানুষ কৃত্রিমভাবে নিজের প্রকৃতিকে অপ্রকৃতিস্থ করতে শিখেছে। চেয়েছে রুক্ষ বাস্তবতা, দারিদ্র্য-দহন থেকে পালিয়ে উদ্দ্যম কল্পনা আর ভ্রান্তি বিলাসে বুঁদ হয়ে থাকতে।

নেশার জগতেও ঘটেছে নানা রূপান্তর। এসেছে কোকেন, এসএসডি আর হেরোইন। এদের প্রত্যেকের উপকরণ, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া পৃথক ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের ক্ষমতা আলাদা আলাদা। মাদকের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন হলো আফিম। তৈরি করেন কাঁচা আফিম। তা থেকে হয় 'মারফিন বেস'।

পোস্ত নির্যাস থেকে কৃষকরা । আফিম থেকেই বিশেষ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন হয় সর্বনাশা হেরোইন। হেরোইন বিভিন্নভাবে শরীরে প্রবেশ করানো হয়। তার মধ্যে প্রধান-

ক. ধূমপানের মাধ্যমে,
খ. ইনহেল-এর মাধ্যমে
গ. সরাসরি সেবনের মাধ্যমে,
ঘ. স্কিন পপিং ও
ঙ. মেইন লাইনিং পদ্ধতিতে।

মাদকাসক্তির অপকারিতা

'হেরোইন' আজ সব নেশাকেই ছাড়িয়ে গেছে। হেরোইনের 'পুরিয়া' আজ নেশাড়ুদের হাতে হাতে ঘুরছে। 'বাদামি' আর 'সাদা' দুই রূপেই হেরোইন বিরাজ করছে। দুই-ই দেহের পক্ষে ভীষণ রকম ক্ষতিকারক। হেরোইন শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতাকে নিঃশেষ করে দেয়। ক্রমশ ভোঁতা, অসাড় হয় মাদকাসক্ত ব্যক্তির মননশক্তি।

এদের ক্ষিদে পায় না। ঘুম হয় না। হাসি-কান্নার বোধ থাকে না। ওজন কমে যায়। ধীর ধীরে এক অস্বাভাবিক, জীবস্মৃত অবস্থায় পৌঁছে যায়। নিয়মিত নেশাখোরদের হঠাৎ ড্রাগ বন্ধ করে দিলে তার ফল হয় আরও মারাত্মক। শুরু হয় প্রচণ্ড শারীরিক যন্ত্রণা।

একে বলা হয় 'উইথড্রয়াল সিমটম'। এ অবস্থায় অনেক সময় মানুষটির হৃদযন্ত্র। হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ঠিক সময়ে নেশার পুরিয়াটি না পেলে শুরু হয় 'টার্কি পিরিয়ড'। তখন হাত-পা কাঁপতে থাকে। পেটে অসহ্য যন্ত্রণা হয়। শরীরে এক অসম্ভব খিচুনি শুরু হয়। চোখ-নাক দিয়ে জল ঝরে। চিকিৎসা না করালে মৃত্যু ঘনিয়ে আসে।

প্রতিকার:

মাদকদ্রব্যের ছোবলে গোটা দেশ আজ আক্রান্ত। দুরারোগ্য ব্যাধির মতোই তা তরুণ সমাজকে গ্রাস করছে। এর তীব্র দংশনে ছটফট করছে কত ছাত্রযুবক। এর ভয়াবহ পরিণতি দেখে আজ প্রশাসন বিচলিত, অভিভাবকরা আতঙ্কিত, চিকিৎসকেরা দিশেহারা। ড্রাগ আসক্তদের জন্যে খোলা হয়েছে 'অ্যান্টি ড্রাগ সেল'।

ড্রাগের ছোবল থেকে স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রী, যুবসমাজকে বাঁচানোর জন্যে সরকারও এগিয়ে এসেছে। দেশে হেরোইন চোরাচালানীদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর আইন হয়েছে। পোস্টারে, বিজ্ঞাপনে, সরকারি প্রচার মাধ্যমে চলছে এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ। ড্রাগ আসক্তদের প্রতি আর কোনো অবজ্ঞা নয়, সহানুভূতির সঙ্গে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।

ভালোবাসতে হবে সেই পথভ্রান্তদের। আবার তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে। চূড়ান্ত সমাধান ডাক্তার বা প্রশাসনের কারও হাতেই নেই। রয়েছে সম্মিলিতভাবে প্রত্যেকটি মানুষের হাতে। তাই কিশোর-যুব-প্রৌঢ় নির্বিশেষে সকলের ওপরই আজ কঠোর দায়িত্ব। এজন্যে পাড়ায় পাড়ায় গড়ে তুলতে হবে প্রতিরোধ ব্যবস্থা। আজ সবাইকে সামিল হতে হবে এ নেশার বিরুদ্ধে। এ সমস্যার প্রতিকার নিম্নলিখিতভাবে করা যেতে পারে। যেমন:

ক. পরিবারকে অসচেতন, উদাসীন না থেকে তাদের সন্তানদের প্রতি সচেতন হতে হবে।
খ. মাদকদ্রব্য চোরাচালান বিরোধী কর্মসূচিকে জোরদার করতে হবে।
গ. বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
ঘ. মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ করতে হবে।
৬. ব্যক্তিগত ও সামাজিক দক্ষতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা চালাতে হবে।
চ. খারাপ সঙ্গ পরিত্যাগ করতে হবে।
ছ. মাদকদ্রব্যের কুফল ও মাদকাসক্তদের ভয়াবহ অবস্থার কথা বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে ও সংবাদপত্রে নিয়মিতভাবে প্রচার করতে হবে।

উপসংহার:

তরুণ-তরুণীরাই দেশের ভবিষ্যৎ। তারা মাদকাসক্ত হয়ে পঙ্গু হওয়ার অর্থ দেশ পঙ্গু হয়ে যাওয়া। সুস্থ-সবল মানুষই পারে দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে। এ বাস্তব সত্যকে স্বীকার করে নিয়ে নেশার রাহুগ্রাস থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষার দায়িত্ব কেবল সরকারের একার নয়, সকলের।

মাদকাসক্তি ও তার প্রতিকার রচনা ২০ পয়েন্ট

উপরোক্ত মাদকাসক্তি অপকারিতা ও প্রতিকার রচনা যদি আপনার বুঝতে অসুবিধা হয় তাহলে নিম্নলিখিত মাদকাসক্তি ও তার প্রতিকার রচনাটি লিখতে। নিম্নলিখিত এই রচনাটির মধ্যে বেশকিছু পয়েন্ট নিযুক্ত করা হয়েছে যেটি আপনার আর্টিকেলকে আরো মজবুত করে তোলে।

অনেক শিক্ষার্থী রয়েছেন যাদের একটা রচনা পছন্দ হয় না আর একটা রচনা দেখেন তাদের মধ্যে যেটা পছন্দ হয় সেই রচনাটি তারা পড়েন। আপনারা অনেকেই মাদকাসক্তি ও তার প্রতিকার রচনা 20 পয়েন্ট খুজে থাকেন বা যারা পয়েন্ট ভিত্তিক খুঁজে থাকেন এই রচনাটি তাদের জন্য। আর আপনাদের এই কথাটি চিন্তা করে আমি নিজে মাদকাসক্তি ও তার প্রতিকার রচনা আরো সহজ ভাবে তুলে ধরলাম।
মাদকাসক্তি-ও-তার-প্রতিকার-রচনা

মাদকাসক্তি ও তার প্রতিকার রচনা

ভূমিকা:

বিশ্বব্যাপী মানবসভ্যতার জন্য এক নিকষ কালো অধ্যায় মাদকাসক্তি। মাদক এক সর্বনাশা মরণনেশা। বিশ্বের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কোটিরও বেশি মানুষ এ মরণনেশায় আসক্ত। এর মধ্যে এশিয়ার সার্কভুক্ত ৭টি দেশে এর সংখ্যা এক কোটির কিছু বেশি। বাংলাদেশেও মোট জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ মাদকের নীল নেশায় আক্রান্ত।

বিশেষ করে তরুণদের মাঝে মাদকের ভয়াবহ প্রভাব অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবার, সমাজ, দেশ- এককথায় সমগ্র জাতি। দুর্বার তারুণ্য হারিয়ে ফেলছে অফুরান প্রাণশক্তি, অজেয় সাহস আর বিদ্রোহী মনোবল। দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও প্রগতি হচ্ছে বিপন্ন।

মাদকের উৎস:

আন্তর্জাতিক বেশ কিছু চোরাচালানি সিন্ডিকেট আকাশপথে কিংবা সীমান্তপথে মাদক পাচারের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। বাংলাদেশেও এ ধরনের সিন্ডিকেট সক্রিয়। কিছুকাল আগেও থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম নিয়ে গড়ে উঠেছিল 'গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গাল' বা 'স্বর্ণ ত্রিভুজ' নামে আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের স্বর্গভূমি।

ভিয়েতনামে কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল ভেঙে যায়। পরবর্তীকালে ইরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে নিয়ে গড়ে তোলা হয় মাদক পাচারের নতুন স্বর্গ 'গোল্ডেন ক্রিসেন্ট।'

পৃথিবীব্যাপী মাদকদ্রব্যের অবাধ বিস্তৃতির পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক এসব মাফিয়া চক্র। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কাজ করছে এদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। সন্ত্রাসবাদের মদদপুষ্ট এ মাদক কারবারিরা যেসব মাদকদ্রব্য চোরাচালান করে থাকে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হেরোইন, ইয়াবা, আফিম, কোকেন, মারিজুয়ানা, ব্রাউন সুগার, হাসিস, স্মাক, হোপ ইত্যাদি।

নেশার ইতিহাস সুপ্রাচীন হলেও তা ছিল মদ, গাঁজা, আফিম, চরস, ভাং ইত্যাদির মধ্যে সীমিত। ফরাসি বিপ্লবের সময় পরাজিত সৈনিকদের অনেকেই হতাশা থেকে মুক্তি পেতে মাদকে আসক্ত হন। কিছু কিছু মাদক ব্যথা নিরাময়ে এবং চেতনানাশক হিসেবে ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এবং এর পরে ব্যথা উপশম ছাড়াও নেশার উপকরণ হিসেবে মাদকের ব্যবহার বৃদ্ধি পেতে থাকে। ব্রাজিল, বলিভিয়া, কলম্বিয়া, ইকুয়েডরসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে মাদক তৈরি ও চোরাচালানের বিশাল চক্র গড়ে ওঠে। সেই সাথে তা পাচার হতে থাকে পৃথিবীর অন্য দেশগুলোয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক জরিপে দেখা গেছে, অতীতে উন্নত দেশগুলোর শতকরা ৮০ ভাগ লোকই মাদকে কমবেশি আসক্ত ছিল। বর্তমানে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোতেও এ আসক্তি ছড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের মাদকের মধ্যে তরুণ সমাজে হেরোইন ও ফেনসিডিল সব নেশাকে ছাড়িয়ে গেছে। হেরোইন এমনই মারাত্মক শক্তিশালী মাদক যে, কেউ কৌতূহল বশেও যদি এ মাদক গ্রহণ করে তাহলে তা থেকে সে আর সহজে মুক্ত হতে পারে না।

মাদকাসক্তির কারণ:

মাদকাসক্তির পেছনে রয়েছে নানা রকম কারণ। তবে কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণে মানুষ মাদকাসক্ত হয় না। অনেকেই কৌতূহল বশে মাদক গ্রহণ শুরু করলেও পরবর্তীতে এই আসক্তি জীবনের জন্য মারাত্মক অভিশাপ জেনেও এর শৃঙ্খল থেকে বের হতে পারে না। অনেক সময় ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও নানাবিধ আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি মানুষকে এ অভিশপ্ত জীবনের দিকে ঠেলে দেয়। মাদকাসক্তির পেছনে প্রধান যে কারণগুলো দায়ী তা হলো:
  1. কৌতূহল মেটাতে;
  2. আসক্ত বন্ধু-বান্ধবের চাপে পড়ে;
  3. পারিবারিক অশান্তির কারণে;
  4. বেকারত্ব ও নিঃসঙ্গতা থেকে;
  5. নানাবিধ কারণে জীবনে হতাশা ও দুঃখবোধ থেকে;
  6. পারিবারিক বন্ধনে শিথিলতা, নিয়ন্ত্রণহীনতা থেকে;
  7. মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা;
  8. মাদক কারবারিদের সংস্পর্শ;
  9. চিত্ত-বিনোদনের অভাবে;
  10. জীবনে একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পাওয়ার আশা;
  11. সাময়িক ভালো লাগার আকর্ষণ।
  12. প্রেমঘটিত কারণে।
আধুনিক মনোবিজ্ঞানীদের মতে, সুস্থ বিনোদনের অভাবে মানুষ নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে।

মাদকাসক্তির পরিণাম:

মাদকাসক্তির পরিণাম তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া। মাদকের নেশায় আচ্ছন্ন মানুষ নানারকম অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। আসক্ত ব্যক্তির আচার-আচরণে দেখা যায় অস্বাভাবিকত্ব। স্নায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে। অনুভূতি ও মননশক্তি হয়ে যায় অসাড়। কাজের ক্ষমতা লোপ পায়। সেই সাথে নানারকম রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয় এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।

মাদকাসক্ত ব্যক্তির ভালো কাজের প্রতি অনীহা ও মন্দ কাজের প্রতি আকর্ষণ এবং মূল্যবোধের অবক্ষয় সমাজ জীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি যেহেতু পরিবারের বাইরেও সামাজিক জীবনযাপন করেন, সেহেতু এর প্রভাব ব্যক্তি ও পরিবারের গণ্ডি ছাড়িয়ে সমগ্র আর্থ-সামাজিক কাঠামোর ওপর পড়ে আর আসক্তিজনিত কুফলগুলো দ্বারা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সংক্রমিত হয়। দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও অগ্রগতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

বাংলাদেশে মাদকাসক্তির প্রভাব:

বাংলাদেশে মাদকাসক্তির পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্য চোরাচালানকারীদের ব্যবসার জন্য লোভনীয় স্থান এখন এ দেশ। বিশেষভাবে আমাদের যুব সমাজের একটা বিরাট অংশ মারাত্মকভাবে ঝুঁকে পড়ছে মাদকের দিকে। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে যুবসমাজ বিভিন্ন সন্ত্রাসী ও বেআইনি কাজে জড়িয়ে পড়ছে।

অসংখ্য মানুষ হৃদরোগ, যক্ষ্মা, ফুসফুসে পানি জমা, লিভারের জটিলতা, কিডনি রোগ, অপুষ্টি, ক্ষুধামন্দা, রক্তহীনতা, মস্তিষ্ক বিকৃতি, ক্যান্সার, বন্ধ্যাত্বসহ নানারকম রোগে ভুগছে মাদকের কারণে। শারীরিক সমস্যার বাইরে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও এ কারণে বেড়ে যাচ্ছে। সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে মানবিক বন্ধন ও শৃঙ্খলতা ভেঙে পড়ছে। সমাজ জীবন ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলেছে।

মাদকাসক্তি প্রতিরোধ:

মাদকাসক্তি সমাজজীবনে এক নির্মম অভিশাপ। তাই এর ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে বিশ্ব আজ সচেতন। বিশ্বের দেশে দেশে সংগঠিত হচ্ছে মাদকবিরোধী আন্দোলন। বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই।


সর্বগ্রাসী মাদকের ভয়াল থাবা থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা করার জন্য গ্রহণ করা হয়েছে বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগ। এগিয়ে এসেছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সমাজসেবী সংস্থা। সরকারের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক মাদকাসক্তি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন জেলায় তৈরি করা হয়েছে বেশ কিছু নিরাময় কেন্দ্র।

মাদক চোরাচালানকারীদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর আইন হয়েছে। মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং মাদকাসক্তদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে যেসব বিষয়ের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে তা হলো:

১. মাদকাসক্তদের অবজ্ঞা না করে তাদের শারীরিক এবং মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা;
২. মাদক ব্যবসা ও চোরাচালানের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলা;
৩. ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি;
৪. সুস্থ বিনোদনমূলক কার্যক্রমের বিস্তার ঘটানো;
৫. মাদকাসক্তির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে গণসচেতনতামূলক প্রচারণার ব্যবস্থা করা;
৬. মাদকদ্রব্য চোরাচালান রোধ করার জন্য কঠোর আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে গণআন্দোলন গড়ে তোলা ইত্যাদি।

উপসংহার:

মাদকের অপশক্তি সবচেয়ে বেশি গ্রাস করছে তরুণসমাজকে। সুতরাং মাদকদ্রব্যের অপব্যবহারের অর্থই হলো দেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিপর্যস্ত হয়ে পড়া। তাই গ্রহণকাল শুরু হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। মাদকের অপশক্তির বিরুদ্ধে গড়ে তুলতে হবে ব্যাপক আন্দোলন। এ দায়িত্ব পরিবারের, সমাজের এবং রাষ্ট্রের।

লেখকের মন্তব্য

আমরা এই পুরো আর্টিকেলের মধ্যে মাদকাসক্তির অপকারিতা ও প্রতিকার রচনা বা মাদকাসক্তি ও তার প্রতিকার রচনা নিয়ে আর্টিকেল দেখলাম। আর্টিকেলটি আপনি আপনার বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে শেয়ার করুন অথবা আপনি আপনার সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করুন যাতে করে তারাও এই আর্টিকেলটি সহজ ভাবে পড়তে পারে। সেভ করে রাখুন আপনার ডিভাইসে। এরকম গুরুত্বপূর্ণ পড়াশোনা তথ্য পেতে আমাদের ওয়েবসাইট প্রতিদিন ভিজিট করুন।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

ইভিভিটিভি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়;

comment url