আত্মবিলাপ কবিতার মূলভাব সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

তুমি কবিতার মূলভাব জানলে সহজেই পরীক্ষার খাতায় প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায়। কবিতাটি ভালোভাবে বুঝতে অবশ্যই কবিতার মূলভাবটি পড়া প্রয়োজন। এই আর্টিকেলে আত্মবিলাপ কবিতার মূলভাব এবং সংক্ষিপ্ত প্রশ্নের উত্তর তুলে ধরা হয়েছে। এই মূল ভাবটি এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে যাতে সহজেই সবাই বুঝতে পারে।
আত্মবিলাপ-কবিতার-মূলভাব
তবে আত্মবিলাপ কবিতার মূলভাব জানার সঙ্গে সঙ্গে নিম্নলিখিত কবিতার সংক্ষিপ্ত প্রশ্নগুলো আপনারও দেখে নেওয়া উচিত।
সূচিপত্র

আত্মবিলাপ কবিতার মূলভাব

'আত্ম-বিলাপ' কবিতাটি কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের আত্মোপলব্ধির চরম প্রকাশ বিশেষ। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত ব্যক্তিগত জীবনে উচ্চাশার বশবর্তী হয়ে নিজ দেশ, ধর্ম, সংস্কৃতি ও ভাষা পরিত্যাগ করে ভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও ভাষাকে বরণ করেছিলেন। কিন্তু অচিরেই তাঁর ভুল ভেঙে যায়। তিনি মর্মে মর্মে বুঝতে পারেন যে তাঁর এ উচ্চাশা পোষণ অনুচিত ছিল।
নিজের বিস্তৃত জীবনের ব্যর্থতার কারণসমূহ তিনি এ কবিতায় আক্ষেপের সাথে ব্যক্ত করেছেন। আশাবাদী মানুষের জীবন যন্ত্রণার স্বরূপ উদঘাটিত হয়েছে কবিতাটির প্রতি চরণে চরণে। জীবন-দর্শন এ কবিতার সবখানি জুড়ে আছে।

জীবনবোধ এখানে প্রবলভাবে উদ্ভাসিত হয়েছে। আশার পিছনে কালক্ষেপণ করে কবি যে করুণ জীবন-অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন 'আত্ম-বিলাপ' কবিতায় তারই প্রকাশ ঘটেছে। আশার ছলনায় ভুলে কবি জীবনের অমূল্য সময় ব্যয় করেছেন। যখন তিনি জীবনের এ ফাঁকিটুকু বুঝতে পেরেছেন তখনই প্রশ্ন তুলেছেন- এতদিন ভুলে থেকে তিনি কী ফল লাভ করেছেন।

তাঁর জীবনের দিনগুলো দ্রুত ধাবমান- সেই সময়কে তিনি তো আর ফিরাতে পারেন না। মিথ্যা আশার পিছনে এতদিন ছোটছুটি করে কবি এখন ভীষণ দায়ে পড়েছেন। এখনও কি কবি সেই সময় আর ফিরে পাবেন? এ প্রশ্নের সাথে সাথে তিনি উপলব্ধি করেছেন যে, জীবনের প্রধান উপকরণ যে যৌবন তাওতো ফুরিয়ে যাচ্ছে।

নিজের প্রমত্ত মনকে ধিক্কার দিয়ে তিনি পুনরায় প্রশ্ন করেছেন- রে প্রমত্ত মন আর কতদিন পরে তোর এ স্বপ্ন ভাঙবে- করে তাঁর মন জেগে উঠবে; এমনকি জীবন-উদ্যানে তাঁর যৌবন-কুসুম ভাতি কতদিন রবে সে প্রশ্নও কবি করেন। দূর্বাদলের নীরবিন্দুর মতো ক্ষণস্থায়ী জীবন যে কোনো সময় শেষ হয়ে যাবে। আশা মানুষকে স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু সে স্বপ্ন দেখে কেবল কাঁদতেই হয়।

বিদ্যুৎ যেমন পথিককে ক্ষণিকের জন্য আলোকিত করে ধাঁধায় ফেলে; মরীচিকা কেবল পথিককে যেমন জলের আশায় বিচলিত করে তেমনি আশারূপী মরীচিকা মানুষের জীবনকে ভুলিয়ে ভালিয়ে দিকভ্রান্ত করে রাখে। প্রেমের নিকুঞ্জ রচনা করতে গিয়ে মানুষ নিজের পায়ে শৃঙ্খল পরায়, পতঙ্গের ন্যায় আগুনে ঝাঁপ দেয়, ফুল তুলতে গিয়ে কেবল কাঁটার আঘাত পায়,

কিন্তু অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না। মণির সন্ধান করতে গিয়ে সর্পদংশন হয়ে মরণ যন্ত্রণাই ভোগ করতে হয় মানুষকে। কবি দিকভ্রান্ত মানুষের মতোই খ্যাতির লোভে ছুটে বেড়িয়েছেন, কিন্তু সফলকাম হতে পারেননি। তখন আক্ষেপ করে নিজের মনকে প্রশ্ন করেছেন- যশোলাভ লোভে কতদিন এতদিন মিথ্যা আশায় ছিলেন অনাহারে অনিদ্রায়।

মুক্তার লোভে ডুবুরি অতল জলে ডুব দিতে দিতে মহামূল্যবান আয়ু ফুরিয়ে ফেলে কিন্তু মুক্তা পায় না। মানুষও তেমনি আশার কুহকে ভুলে গতায়ু হয়ে পড়ে কিন্তু কাঙ্ক্ষিত বস্তুর সন্ধান পায় না। কবি ডুবুরির ন্যায় সারাজীবন যত্রতত্র লাভের আশায় ডুবে ফিরেছেন। কিন্তু লাভ করতে পারেননি কিছুই। শেষ জীবনে দাঁড়িয়ে তাই তিনি নিজের প্রমত্ত মনের কাছে প্রশ্ন করেছেন।

এ প্রশ্নের উত্তর তিনি তাঁর প্রশ্নের মধ্যেই রেখে গিয়েছেন। জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা তাঁকে বিলাপ করতে বাধ্য করেছে। ব্যর্থ জীবনের দুর্বহ বোঝা বয়ে বেড়ানোই তাঁর সার হয়েছে। আশার পিছনে ছোটায় ভুলের মাশুল গুনতে গুনতে তিনি আজ ক্লান্ত শ্রান্ত ও বিধ্বস্ত।

যে আশার পিছনে তিনি সারাটা জীবন ঘুরে বেড়িয়েছেন সেই আশা পরিণামে দুঃখ ছাড়া কিছুই দিতে পারেনি তাঁকে। কবির এ তিক্ত ও নির্মম জীবন অভিজ্ঞতাই 'আত্ম-বিলাপ' কবিতায় ব্যক্ত হয়েছে। আশার মোহপাশে পড়ে মানুষ জীবনের অমূল্য সময় ক্ষয় করে ফেলে।

সহজলভ্য সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যকে উপেক্ষা করে সোনার হরিণ পাওয়ার আশায় অনবরত ছুটে ছুটে যখন তার আয়ু শেষ হয়ে যায় তখন বিলাপ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না তার। সুতরাং আশারূপী ছলনার কাছ থেকে দূরে থাকা সকলের একান্ত কর্তব্য।

অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ক বিভাগ

  • আধুনিক বাংলা কবিতার/ নাটকের/ ট্র্যাজেডি নাটকের/প্রহসনের/ সনেটের/ অমিত্রাক্ষর ছন্দের/পত্রকাব্যের/মহাকাব্যের জনক কে?

    উত্তরঃ মাইকেল মধুসূদন দত্ত।
  • মাইকেল মধুসূদন দত্তের পিতা ও মাতার নাম কী?

    উত্তর। পিতা: রাজনারায়ণ দত্ত এবং মাতা: জাহ্নবী দেবী।
  • মধুসূদনের কয়েকটি কাব্যের নাম লেখ।

  • উত্তরঃ 'তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য', 'বীরাঙ্গনা কাব্য', 'ব্রজাঙ্গনা কাব্য', 'মেঘনাদবধ কাব্য'।
  • মধুসূদন দত্তের পারিবারিক নাম কী ছিল?

    উত্তর। মধুসূদনের পারিবারিক নাম শ্রী মধুসূদন দত্ত।
  • মধুসূদনের ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ জন্মে কখন?
    উত্তর। হিন্দু কলেজে অধ্যয়নকালে।
  • তিনি কোথায় কোথায় অধ্যয়ন করেন?
    উত্তর। হিন্দু কলেজ এবং বিশপস কলেজ।
  • মধুসূদন দত্ত কত সালে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন?
    উত্তর। মধুসূদন ১৮৪৩, ৯ ফেব্রুয়ারি খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন।
  • মধুসূদন মাদ্রাজে অবস্থান করেন কোন সময়?
    উত্তরঃ ১৮৪৮-১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত।
  • মধুসুদন দত্ত কতটি ভাষা জানতেন?
    উত্তর। মধুসূদন ১৩/১৪টি ভাষা জানতেন।
  • মাদ্রাজে থাকাকালীন তিনি কোন কোন ভাষা শিক্ষা করেন?
    উত্তর। সংস্কৃত, গ্রিক, ল্যাটিন, হিব্রু, ফরাসি, তেলেগু, তামিল, জার্মান, ইটালিয়ান।
  • মধুসূদন কোন কলেজ থেকে গ্রিক ও ল্যাটিন ভাষা শিক্ষা গ্রহণ করেন?
    উত্তরঃ মধুসূদন বিশপস কলেজ থেকে গ্রিক ও ল্যাটিন ভাষা শিক্ষা গ্রহণ করেন।
  • মাদ্রাজে মধুসুদন কোন পত্রিকার সাথে সম্পৃক্ত হন?
    উত্তরঃ মধুসূদন এথিনিয়ম পত্রিকার সাথে সম্পৃক্ত ন। "শেক্সপীয়র নিউটন হতে পারে, কিন্তু
  • নিউটন শেক্সপীয়র হতে পারে না।"- উক্তিটি কার?
    উত্তর। উক্তিটি মধুসূদন দত্তের।
  • বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহাকাব্য 'মেঘনাদবধ কাব্য' তিনি কত সালে রচনা করেন?
    উত্তরঃ ১৮৬১ সালে।
  • 'জীবন-উদ্যানে' শব্দের অর্থ কী?
    উত্তরঃ জীবনের খেলাঘরে।
  • 'ভাতি' শব্দের অর্থ কী?
    উত্তরঃ আলো, প্রদীপ।
  • 'নীর' শব্দের অর্থ কী?
    উত্তরঃ 'নীর' শব্দের অর্থ পানি, জল।
  • 'অনুবিন্দু অনুমুখে সদ্য পাতি' বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
    উত্তরঃ জল সর্বদা সাগরের দিকে ধেয়ে যায়।
  • 'ক্ষণপ্রভা' শব্দের অর্থ কী?
    উত্তরঃ বিদ্যুৎ, বিজলি।
  • 'নিগড়' শব্দের অর্থ কী?
    উত্তর। 'নিগড়' শব্দের অর্থ খাঁচা।
  • 'প্রাবক-শিখা' শব্দের অর্থ কী?
    উত্তরঃ আগুনের শিখা।
  • 'মৃণাল' শব্দের অর্থ কী?
    উত্তরঃ ফুলের বোঁাঁ।
  • 'মাৎসর্য-বিষদমান' শব্দের অর্থ কী?
    উত্তর। ইন্দ্রিয়ের দংশন।
  • 'ধীবর' শব্দের অর্থ কী?
  • উত্তর। 'ধীবর' শব্দের অর্থ জেলে।
  • 'কুহক-ছলে' শব্দের অর্থ কী?
    উত্তর। কুহেলিকার ছলনায়।
  • . 'গীতিকবিতা' আসলে কোন ধরনের কবিতা?
    উত্তরঃ মন্ময়, আত্মনিষ্ঠ 'বা গীতিকবিতা (সাবজেকটিয় পয়েট্রি) এক ধরনের ব্যক্তনিষ্ঠ বা আত্মনিষ্ঠ কবিতা।
  • 'গীতিকবিতা' কাকে বলে?
    উত্তর। কবির একান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতি বা ভাব দানা যখন ব্যঞ্জনা রসে সুষমামণ্ডিত হয়ে সহজ ও সাবলীল ভাষায় আত্মপ্রকাশ করে তখনই গীতিকবিতার জন্য হয়।
  • 'গীতিকবিতা'র সাধারণ অর্থ কী?
    উত্তরঃ মন্ময়, এই গীতি কবিতার সাধারণ অর্থ গান ও কবিতার সংমিশ্রণ।
  • ইংরেজি সাহিত্যে 'গীতিকবিতা'কে কী বলে?
    উত্তরা। ইংরেজি সাহিত্যে গীতি কবিতাকে Lyric বলে।
  • 'গীতিকবিতা'র নামকরণের তাৎপর্য কী?
  • উত্তরঃ Lyric বা সংগীতমূলক কবিতাগুলো রীণা যন্ত্রের সাহায্যে গীত হতো বলে একে গীতিকবিতা বলে।

    সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

প্রশ্না। মাইকেল মধুসুদন দত্তের 'আত্ম-বিলাপ' কবিতার সারমর্ম সংক্ষিপ্তকারে উপস্থাপন কর।

উত্তরা: 'আত্ম-বিলাপ' কবিতাটি কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের আত্মোপলব্ধির চরম প্রকাশ বিশেষ। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত ব্যক্তিগত জীবনে উচ্চাশার বশবর্তী হয়ে নিজ দেশ, ধর্ম, সংস্কৃতি ও ভাষা পরিত্যাগ করে ভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও ভাষাকে বরণ করেছিলেন। কিন্তু অচিরেই তাঁর ভুল ভেঙে যায়। তিনি মর্মে মর্মে বুঝতে পারেন যে তাঁর এ উচ্চাশা পোষণ অনুচিত ছিল।


কবিতার সারমর্ম: কবি 'আত্ম-বিলাপ' কবিতায় বলতে চেয়েছেন মানুষ আশাবাদী; আশার উপর নির্ভর করে মানুষ বেঁচে থাকে। কিন্তু আশা ছলনাময়ী। সে মানুষকে সতত প্রতারিত করে। তার কুহেলিকায় পড়ে হতভাগ্য মানুষ বঞ্চিত ও প্রতারিত হয়।

এ ছলনাময়ীর ছলনায় ভুলে মানুষ হারিয়ে ফেলে তার সবচেয়ে মূল্যবান জীবন ও সময়কে। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত ব্যক্তিগত জীবনে উচ্চাশার বশবর্তী হয়ে নিজ দেশ, ধর্ম, সংস্কৃতি ও ভাষা পরিত্যাগ করে ভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও ভাষাকে বরণ করেছিলেন। কিন্তু অচিরেই তাঁর ভুল ভেঙে যায়। তিনি মর্মে মর্মে বুঝতে পারেন যে তাঁর এ উচ্চাশা পোষণ অনুচিত ছিল।

মধুসূদন নিজের ভুল বুঝতে পেরে আবার স্বদেশে ফিরে এসে মাতৃভাষায় সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। এ সাহিত্যচর্চার মধ্যেই তিনি 'আত্ম-বিলাপ' কবিতাটি রচনা করে আশারূপী ছলনাময়ীর মুখোশ উন্মোচন করেছেন।

খ্যাতি-যশ-অর্থ-প্রতিপত্তির আশায় মানুষ তার মহামূল্যবান সময় অপচয় করে ফেলে। ফুলের সুগন্ধে আকৃষ্ট হয়ে কীটপতঙ্গ যেমন তার দিকে ধাবিত হয় তেমনি মানুষও উচ্চাকাঙ্ক্ষার বশবর্তী হয়ে ছলনাময়ী আশার পিছনে ছুটে। কিন্তু একটিবারের জন্যও সে ভেবে দেখে না যে এর পরিণাম কী? এ ছোটাছুটির পরিণাম হতাশা।

তাই হতাশার পরিণাম থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সকলকে সজাগ ও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন কবি। কারণ হতাশা থেকে মুক্ত হতে না পারলে জীবনের সবকিছুই ব্যর্থ ও মূল্যহীন হয়ে পড়ে।

মন্তব্য: আশার মোহপাশে পড়ে মানুষ জীবনের অমূল্য সময় ক্ষয় করে ফেলে। সহজলভ্য সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যকে উপেক্ষা করে সোনার হরিণ পাওয়ার আশায় অনবরত ছুটে ছুটে যখন তার আয়ু শেষ হয়ে যায় তখন বিলাপ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না তার। সুতরাং আশারূপী ছলনার কাছ থেকে দূরে থাকা সকলের একান্ত কর্তব্য।

গীতিকবিতা কী বা কাকে বলে?

আত্মবিলাপ-কবিতার-মূলভাব
উত্তরা: মন্ময়, আত্মনিষ্ঠ বা গীতিকবিতা (সাবজেকটিভ পয়েট্রি) এক ধরনের ব্যক্তনিষ্ঠ বা আত্মনিষ্ঠ কবিতা। কবির একান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতি বা ভাব কল্পনা যখন ব্যঞ্জনা রসে সুষমামন্ডিত হয়ে সহজ ও সাবলীল ভাষায় আত্মপ্রকাশ করে তখনই গীতিকবিতার জন্ম হয়। এই গীতিকবিতার সাধারণ অর্থ গান ও কবিতার সংমিশ্রণ। ইংরেজি সাহিত্যে গীতিকবিতাকে Lyric বলে। Lyric বা সংগীতমূলক কবিতাগুলো বীণা যন্ত্রের সাহায্যে গীত হতো বলে একে গীতিকবিতা বলে।

প্রামাণ্য সংজ্ঞা: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ভাষায়: "বক্তার ভাবোচ্ছ্বাসের পরিস্ফুটন মাত্র যাহার উদ্দেশ্য তাহাই গীতিকবিতা।"

মোহিতলাল মজুমদার এর মতে "যা আমরি অবস্থা, অথচ স্পষ্টগোচর নয়, যে বেদনা ব্যাকুল অথচ স্পষ্ট হয়ে ওঠে না যে সৌন্দর্যের আভাস পায় অথচ দেখেও দেখি না-মানুষের সেই আত্মগত গূঢ়বাসনা এইরূপ অন্তসন্ধানী কবির কল্পনায় জাজ্বল্যমান হয়ে ওঠে।

"S.T Colreidge এর ভাষায়, "Ballad turns upon a single thought and situation."

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর মতে, "যাহোক আমরা গীতিকবিতা বলে থাকি: অর্থাৎ যা একটুখানির মধ্যে একটি মাত্র ভাবের বিকাশ, ঐ যেমন বিদ্যাপতি-

'ভরা বাদর মাহ ভাদর শূন্য মন্দির মোর'
সেই আমাদের মনের বহুদিনের
অব্যক্তভাবে একটি কোন সুযোগ আশ্রয় করিয়া ফুটিয়া ওঠা।"

যে কবিতায় কবির আত্মানুভূতি বা একান্ত ব্যক্তিগত কামনা-বাসনা ও আনন্দ-বেদনা তার প্রাণের অন্তস্থল হতে আবেগ কম্পিত সুরে অখণ্ড ভাব মূর্তিতে আত্মপ্রকাশ করে তাকেই গীতিকবিতা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এই গীতিকবিতায় পরিপূর্ণ মানবজীবনের ইঙ্গিত নেই, এখানে একক ব্যক্তিত্বের একান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতি আনন্দ-বেদনায় পরিপূর্ণ। কবি হৃদয় এখানে আত্মবিমুগ্ধ, তাই সমগ্র কবিতাজুড়ে কবি হৃদয়ে প্রাণের স্পন্দন প্রকাশিত হয়।-

সার্বিক মতামত: বাংলাদেশের জল-হাওয়ার মধ্যে, এর মাটিতে এমন একটি কোমলতা ও সুরের আবেশ আছে যাতে রামায়ণ মহাভারত হতে আরম্ভ চর্যাপদের পূল ছুঁয়ে বৈষ্ণব পদাবলীর তীর ছুঁয়ে রঙ্গালাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা স্পর্শ করে, মধুসূদনের 'মেঘনাদবধ কাব্যে'র শরীর জুড়ে বিহারীলাল চক্রবর্তীর হাতে পূর্ণতা পেয়ে আধুনিক গীতিকবিদের হাতে তাঁর সার্থক পদযাত্রা অব্যাহত আছে। আধুনিক কালের অনেক উৎকৃষ্ট গীতিকবিতা শুধু একতারার একটি গান বা কবির নিজক আত্মগত ভাব কল্পনার প্রকাশ মাত্র নয়। কবি এর মধ্যে কখনো নাটকীয়তা, কখনো মহাকাব্যচিত ব্যঞ্জনার সঞ্চার করেন।

গীতিকবিতার বৈশিষ্ট্যসমূহ উপস্থাপন কর

উত্তর: মন্ময়, আত্মনিষ্ঠ বা গীতিকবিতা (সাবজেকটিভ পয়েট্রি) এক ধরনের ব্যক্তনিষ্ঠ বা আত্মনিষ্ঠ কবিতা। কবির একান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতি বা ভাব কল্পনা যখন ব্যঞ্জনা রসে সুষমামণ্ডিত হয়ে সহজ ও সাবলীল ভাষায় আত্মপ্রকাশ করে তখনই গীতিকবিতার জন্ম হয়। এই গীতিকবিতার সাধারণ অর্থ গান ও কবিতার সংমিশ্রণ। ইংরেজি সাহিত্যে গীতিকবিতাকে Lyric বলে। Lyric বা সংগীতমূলক কবিতাগুলো বীণা যন্ত্রের সাহায্যে গীত হতো বলে একে গীতিকবিতা বলে।

গীতিকবিতার বৈশিষ্ট্যসমূহ:
  1. চিত্রতম প্রকাশ ঘটে।
  2. হৃদয়ের অনুভূতি দীর্ঘস্থাগীতিকবিতা মন্ময় বা ব্যক্তনিষ্ঠ কবিতা।
  3. ভাবের বৈচিত্র্য গীতিকবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ কবি হৃদয়ে বিচিত্র ভাব-ভাবনা গীতিকবিতায় প্রকাশমান।
  4. গীতিকাব্যের কবিরা বহির্মুখী নয়, অন্তর্মুখী-এজন্য গীতিকবিতাতেই সাধারণত ব্যক্তি হৃদয়ে ভাবোচ্ছ্বাস ফুটে ওঠে।
  5. গীতিকবিতায় ছন্দের বিয়ী হয় না বলে তা অবলম্বন করে লেখ গীতিকবিতা দীর্ঘ হয় না।
  6. গীতিকবিতায় কবি চরিত্রে নমনীয়তা, কমনীয়তা ও দৃঢ়তা প্রতিফলিত হয়।
  7. বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলীর গীতিকবিতার এক অনন্য দলিল। যেমন-
  8. "রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর। প্রতি অঙ্গ লাগি-কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর। হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোর-কান্দে। পরাণ পিরীতি লাগি থির নাহি বান্দে।"
  9. আধুনিক গীতিকবিতায় মানুষের বাস্তব জীবন ও সমাজের চিত্র যথাযথভাবে ফুটে ওঠে।
  10. আন্তরিকতাপূর্ণ অনুভূতি। অবয়বের স্বল্পতা, সংগীত মাধুর্য, গতি স্বাচ্ছন্দ্য গীতিকবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য।
  11. ভাব বা বিষয়বস্তুর দিক থেকে গীতিকবিতাকে ভক্তিমূলক, স্বদেশপ্রীতিমূলক, প্রেমমূলক, প্রকৃতি বিষয়ক, সনেট স্তোত্র কবিতা, চিন্তামূলক, শোকগীতি, কাহিনীমূলক ও লঘু বৈঠকী বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়।


সার্বিক মন্তব্য: গীতিকবিতা সৃষ্টিলগ্ন থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত বৈচিত্র্য বিহারী। কবি হৃদয়ে সূক্ষ্মতম অনুভূতির সূক্ষ্মতম প্রকাশ ঘটে গীতিকবিতায়। গীতিকবিতা অনুভূতির প্রকাশ বলে তা সাধারণত দীর্ঘকায় হয় না। কারণ কোনো অনুভূতিই দীর্ঘকাল স্থায়ী হয় না। কিন্তু কোনো কবি যদি গীতিকবিতায় তার ব্যক্তি অনুভূতিকে আন্তরিকতার সাথে অনায়াসে দীর্ঘকারে বর্ণনা করতে পারেন-তবে তার মূল রস ক্ষুণ্ণ হয় না। অর্থাৎ কবির আন্তরিকতাই শ্রেষ্ঠ গীতিকবিতার একমাত্র কষ্টিপাথর।

লেখকের মন্তব্য

এতক্ষণ আমরা আলোচনা করলাম আত্মবিলাপ কবিতার মূলভাব সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর। আর্টিকেলটি ভালো লাগলে দেরি না করে এখনি শেয়ার করে দেন আপনার বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে। এরকম আরো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেতে আমাদের ওয়েবসাইট উদ্দিন ভিজিট করুন। আপনার যদি বই না থাকে তাহলেও এই ওয়েবসাইটটি আপনার কাজে আসেত পারে তাই আমাদের সাথেই থাকুন।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

ইভিভিটিভি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়;

comment url