হুযুর কেবলা গল্পের সংক্ষিপ্ত প্রশ্নের উত্তর খ বিভাগ
আপনি যদি স্নাতক শিক্ষার্থী হয়ে থাকেন তাহলে এই প্রশ্নগুলো আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে আপনারা যারা হুযুর গল্পের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর জানতে চান তাদের জন্য আজকের এই আর্টিকেলটি। এখানে শুধুমাত্র খ বিভাগের কয়েকটি প্রশ্ন তুলে ধরা হয়েছে, যাদের বই নেই তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এমন অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা টাকার অভাবে বই কিনতে পারে না। আপনারা চাইলেই এগুলো দেখে পড়তে পারেন।
সূচিপত্র
প্রশ্ন: ১ গল্পকার আবুল মনসুর আহমদ সম্পর্কে তোমার মতামত দাও
উত্তরঃ আবুল মনসুর আহমদ ১৮৯৮ সালে ময়মনসিংহ জেলার ধানীখোলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলা সাহিত্যের এ কৃতীপুরুষ তাঁর প্রথম জীবনে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। এরপর তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নেন।
সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আবুল মনসুর আহমদ মহাত্মা গান্ধী, মাওলানা আবুল কালাম আযাদ, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, জওহরলাল নেহেরু, শেরে বাংলা ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রমুখ খ্যাতিমান রাজনীতিবিদের সান্নিধ্য লাভ করে, নিজেকে সমৃদ্ধ করেন।
তিনি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ও পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে সাফল্য অর্জন করেছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তিনি ছিলেন সক্রিয় সৈনিক।
রাজনীতির পাশাপাশি আবুল মনসুর আহমদ সাহিতচর্চায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। ব্যঙ্গাত্মক গল্প রচনায় তিনি পারদর্শী ছিলেন। তাঁর রচিত ছোটগল্পে সমাজের অন্যায়, অনিয়ম, দুর্নীতি ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে তীব্র কটাক্ষ হানা হয়েছে। আবুল মনসুরের ব্যঙ্গের একটা অসাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো- সে ব্যঙ্গ যখন হাসায় তখন হয় সে ব্যাঙ;
কিন্তু যখন কামড়ায় তখন সে হয় সাপ। 'আয়না' ও 'ফুড কনফারেন্স' আবুল মনসুর আহমদের অত্যধিক জনপ্রিয় গল্পগ্রন্থ। 'আয়না' গল্পগ্রন্থভুক্ত 'হুযুর কেবলা' গল্পে গল্পকারের বেদনাদীর্ণ হৃদয়ের পরিচয় বিধৃত হয়েছে। এমদাদের প্রতিবাদী চরিত্রের মধ্যে লেখককে খুঁজে পেতে এতটুকু কষ্ট হয় না। ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে কালের সাক্ষী এ লেখক- রাজনীতিবিদ ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
প্রশ্ন: ২ 'হুযুর কেবলা' গল্পের মূলভাব আলোচনা কর।
উত্তর: এমদাদ নামক এক আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত যুবক ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সৈনিক থাকাকালীন বিলেতি দ্রব্য বর্জন করে দেশি পণ্যের ভক্ত হয়ে পড়ে।
এ আন্দোলনে শরিক হতে গিয়ে সে হতাশাগ্রস্ত হয়ে এক সুফি সাহেবের সান্নিধ্যে আসে। সুফি সাহেব এমদাদের আত্মার শান্তি নিশ্চিত করার লোভ দেখিয়ে তার পীর সাহেবের কাছে নিয়ে যায়। এ পীর সাহেব ছিলেন বয়সে প্রবীণ। তাঁর মুখ মেহেদি রঞ্জিত দাড়িতে ঢাকা, কথায় কথায় তিনি কুরআন হাদিসের সূরা-আয়াত আওড়ান। পীর সাহেবের চেহারা ও কথার জৌলুসে মুগ্ধ হয়ে এমদাদ তাঁর মুরিদ হয়ে গেল।
প্রথম প্রথম এমদাদ পীর সাহেবের বুজরুকি ধরতে না পেরে অন্ধের মতো তাঁকে শ্রদ্ধা ভক্তি করতে লাগল। সে প্রথম লতীফা যিক্র জলী শুরু করল। দিনরাত পীর সাহেবের নির্দেশ মোতাবেক অন্ধের মতো 'এলহু' 'এলহু' করতে লাগল। অনাহার আর অনিদ্রার কারণে তার শরীর ভেঙে পড়ল এবং চোখ মাথার মধ্যে ডুকে গেল। তার শরীর দুর্বল ও মন অস্থির হয়ে উঠল।
একসময় সে মুরিদগিরিতে ইস্তফা দিয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য তৈরি হলো। এমন সময় দূরবর্তী গ্রামের মুরিদদের কাছ থেকে দাওয়াত এল। হুযুর কেবলা প্রচুর খাদ্যসামগ্রী সহকারে বিশাল বজরায় চড়ে মুরিদানের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। এমদাদ সাগ্রহে হুযুরের কাফেলার শরিক হিসেবে সহগামী হলো। মুরিদানে পৌছানোর পর হুযুরকে রাজকীয় সংবর্ধনা দেওয়া হলো।
ভিন্ন ভিন্ন বাড়িতে বিশাল বিশাল ভোজ চলতে লাগল। ভালো ভালো খেয়ে এমদাদের চেহারায় পূর্বের চেকনাই ফিরে এল। হুযুরের খাওয়ার বাহার দেখে এমদাদ বুঝতে পারল যে, পীর সাহেবের রুহানি শক্তি যত বেশিই থাকুক না কেন তাঁর হজমশক্তি তার চেয়ে অনেক বেশি।
মুরিদানে সন্ধ্যাবেলায় পুরুষদের মজলিস বসত। আর এশার নামাজের পর অন্দরমহলে মেয়েদের জন্য ওয়াজ হতো। হুযুর পুরুষদের মজলিসের চেয়ে মেয়েদের ওয়াজের প্রতি বেশি আগ্রহী ছিলেন। বাড়িওয়ালার ছেলে রজবের স্ত্রী কলিমনের প্রতি পীর সাহেবের আলাদা নজর লক্ষ করা গেল। একদিন হুযুর তাঁর সাগরেদ সুফি বদরুজ্জামানের সাথে গোপন পরামর্শ করে এক মোরাকেবা অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেন।
সুফি সাহেব মোরাকেবায় বসলে হুযুর তাঁর দেহে রসুলুল্লাহর আত্মাকে প্রবেশ করালেন। 'এমদাদের মনে ভয়ঙ্কর সন্দেহ দানা বাঁধল। হুযুর কৌশলে রসুলুল্লাহর নাম ভাঙিয়ে তার সাথে রজবের স্ত্রী কলিমনের বিবাহের আদেশ জারি করলেন। এমদাদ বাদে সকল মুরিদই সরল বিশ্বাসে এ আদেশ মেনে নিল। জোরপূর্বক রজবকে দিয়ে তার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী কলিমনকে তালাক দেয়ানো হলো।
এরপর হুযুর পরম আগ্রহে বর সেজে কলিমনকে বিবাহ করলেন। অসীম ধৈর্য নিয়ে এমদাদ এ প্রহসন প্রত্যক্ষ করছিল। এক সময় তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। সে বরবেশি হুযুরের উপর পরম আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
সকলে তাকে পাগল আখ্যায়িত করে মারতে মারতে গ্রাম থেকে বের করে দিল। এভাবে হুযুর কেবলা লোক ঠকিয়ে নিজের কাম-লালসা চরিতার্থ করলেন। আমাদের দেশে এভাবেই ধর্মের নামে ভণ্ড পীরেরা নিজেদের কামনা-বাসনা চরিতার্থ করে থাকে।
প্রশ্ন: ৩ 'হুজুর কেবলা' গল্পটি কোন পটভূমিতে রচিত?
উত্তরা; 'হুজুর কেবলা' গল্পটির মধ্যদিয়ে গল্পকার ধর্ম ব্যবসায়ীদের মুখোশ উন্মোচন করেছেন। ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ভণ্ড পীরেরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যে যে কোন গ্রিন কাজ করতে দ্বিধা করে না তার চূড়ান্ত দলিল এ গল্পটি।
গল্পের পটভূমি: এ গল্পে ভণ্ড পীরদের ভোজনপ্রীতি, অর্থলালসা সর্বোপরি নারীলিন্সার পরিচয় ফুঠে উঠেছে। আধুনিক শিক্ষার শিক্ষিত যুবক এমদাদের জীবনভাষ্যের মধ্যদিয়ে এ গল্পে পীর সাহেবের যে কর্মকাণ্ড উঠে এসেছে তা আমাদের হাসির খোরাক জোগায় এবং ধর্ম ব্যবসায়ীদের মুখোশ লেখক জন্ম সম্মুখে তুলে ধরেছেন। তথাকথিত পীর সাহেবদের নারীলিন্দার কারণে যে অতগত সুখী দাম্পত্য জীবন ভেঙে গেছে তা এ গল্পে উপস্থাপিত।
পীরের এক মুরিদের ছেলে রজাবের স্ত্রী কলিমনকে দেখে তার কামুক প্রবৃত্তি জেগে ওঠে। সে কেরামতে নেসবতে বায়ানান্নাস দেখবার নামে সুকৌশলে গ্রামের অজ্ঞ মানুষকে ধোঁকা দিয়ে কলিমনকে বিয়ে করার সকল আয়োজন সম্পন্ন করে। পীর তারই সাগরেদ সুফি সাহেবকে 'মোরাকাবায়' বসিয়ে সফি সাহেবের শরীরে হযরত মুহম্মদ (স.) এর ফারুক আনার মতো মিথ্যাচার করে সুফির মুখ দিয়ে কলিমন বিয়ে করার কথা বলিবে নেয়। যেমন:
"তুমি তওবা আসতাগকার পড়। তুমি খোদার কলম রদ করিতে চাও? তোমার বিবাহ ঠিক হইয়া আছে। বেহেশতে আমি তার ছবি দেখিয়া আমিয়াছি।
সে কে ইয়া রসুলুল্লাহ?
এই বাড়ির মুরিদের ছোট ছেলে রাজবের স্ত্রী কলিমন।"
উপসংহার: সুতরাং বলা যায়, গল্পকার সমকালীন-পটভূমিতে ধর্ম ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যের লাগাম টেনে ধরার প্রয়াসে হুজুর কেবল' গল্পে ভণ্ডামি ও প্রতারণার মুখোশ উন্মোচন করে পীরদের তথাকথিত কেরামতিকে ব্যঙ্গ করেছেন।
কেবলা হুজুরের ভণ্ডামির পর রজবের অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন গল্পকার এভাবে বাপ-চাচা-পাড়া-পড়শীর অনুরোধে, আদেশে, তিরস্কারে ও অবশেষে উৎপীড়নে তিষ্টিতে না পারিয়া রজাব তার এক বছর আগে বিয়ে করা আদরের স্ত্রীকে তালাক দিলো এবং কাপড়ের ফুঁটে চোখ মুছিতে মুছিতে বাড়ির বাহির হইয়া গেল।'
রজবের এ কান্না তার একার নয়- পীরদের ভণ্ডামির শিকার হয়ে মানবজীবনে প্রিয় স্ত্রী-বোন হারানোর কান্না এখানে উপস্থাপিত। এছাড়া তথাকথিত পীর বা ধর্ম ব্যবসায়ীদের মুখোশ উন্মোচন করতে গিয়ে এমদাদের মতো মানুষদের নিগৃহীত ও নির্যাতিত হয়ে তাদের চোখের পানি ফেলার বিষয়টিও এ গল্পে প্রকাশিত।
প্রশ্ন: ৪ 'হুযুর কেবলা' গল্প অবলম্বনে এমদাদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।
উত্তর: আবুল মনসুর আহমদের 'আয়না' গল্পগ্রন্থের অন্তর্গত 'হুযুর কেবলা' গল্পে এমদাদ এক, প্রগতিশীল যুবক। গল্পের কাহিনি এমদাদকে নিয়েই শুরু এবং শেষেও এ এমদাদ। নিম্নে এমদাদ চরিত্রের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা হলো।
এমদাদের পরিচয়: গল্পকার এমদাদের পিতৃপরিচয় বিস্তৃতভাবে এই গল্পে তুলে না ধরা সত্ত্বেও বোঝা যায় যে, সে সচ্ছল
পরিবারের সন্তান। বেশ কিছু তালুক সম্পত্তি সে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত হয়েছিল। পিতৃমাতৃহীন এ যুবকের একমাত্র বিধবা ফুফু ছাড়া আপন কেউ ছিল না। এমদাদ দর্শন শাস্ত্রে অনার্স পড়তে কলকাতায় গিয়েছিল। তখন ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলন তুঙ্গে।
এমদাদ প্রথমে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিলেও শেষতক খেলাফত আন্দোলনের সৈনিক হিসেবে গ্রামে প্রত্যাবর্তন করল। কলকাতার কলেজে এমদাদ যখন দর্শন শাস্ত্রে অনার্স পড়ত তখন সে আল্লাহ রাসূল ও হাদিস কুরআন মানত না। সে খোদার আরশ, ওহি, ফেরেশতা, মোরাকাবা, মিরাজ প্রভৃতি নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করতো।
মিল হিউম, স্পেন্সার, কোঁতে প্রমুখ দার্শনিকের ভাব চুরি করে এমদাদ আল্লাহর অস্তিত্বের অসাড়তা প্রমাণ করে কলেজ ম্যাগাজিনে প্রবন্ধ লিখত। এ সময় গান্ধীজির নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে এমদাদ কলেজ ছেড়ে সেই আন্দোলনে শরিক হলো।
খেলাফত আন্দোলনে যোগদান করে সে একেবারে বদলে গেল। খেলাফত আন্দোলনে যোগ দেওয়ার পর এমদাদ পুরোদস্তুর স্বদেশী ও আস্তিক বনে গেল। কোর্তা ও সাদা লুঙ্গি পরে মুখে দেড় ইঞ্চি দাঁড়ি রেখে মাথায় গোলটুপি পরে চাটিজুতা পায়ে দিয়ে এমদাদ যেদিন গ্রামে ফিরল সেদিন রাস্তার বহুলোক তাকে সালাম দিল। সে ভয়ানক নামাজ পড়তে লাগল।
বিশেষকরে নফল নামাজে সে একেবারে তন্ময় হয়ে পড়ল। বাঁশের কঞ্চি কেটে নিজ হাতে তসবিহ তৈরি করে অষ্টপ্রহর টিপতে টিপতে আঙ্গুলের মাথা ছিঁড়ে ফেলল। কিন্তু কিছুতেই সে এবাদতে নিষ্ঠা আনতে পারল না।
শেষ অবধি এমদাদ এক পরিচিত সুফি সাহেবের শরণাপন্ন হলো। সে পীর সাহেবের মুরিদ হয়ে গেল। মুরিদ হওয়ার পর এমদাদ পীরের নির্দেশে যিকরে জলী আরম্ভ করল। সে দিনরাত দুই চোখ বুজে 'এলহু এলহু' করতে লাগল। অনাহারে ও অনিদ্রায় এমদাদের চোখ দুটি মাথার মধ্যে প্রবেশ করল। তার শরীর নিতান্ত দুর্বল ও মন অত্যন্ত অস্থির হয়ে পড়ল।
বিশ্বাস অবিশ্বাসের ছন্দদোলায় দুলতে দুলতে সে বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা ভাবতে লাগল। এমন সময় দূরবর্তী এক স্থানের মুরিদগণ পীর সাহেবকে দাওয়াত করল। এমদাদ বাড়ি ফিরে যাওয়া স্থগিত রেখে পীর সাহেবের সফরসঙ্গী হলো। মুরিদানে পৌছে এমদাদ পীর সাহেবের আসল চরিত্রের পরিচয় পেতে লাগল। মুরিদানে বসে এমদাদ পীর সাহেবের বুজরুকির ফিকির ধরে ফেলল।
পীর সাহেব যে এই বয়সেও মেয়েদের প্রতি দুর্বল তা তার বুঝতে কষ্ট হলো না। এমদাদ দেখল পীর সাহেব পুরুষের মহলিসের চেয়ে মেয়েদের মজলিসে থাকতে বেশি পছন্দ করেন। বাড়িওয়ালার সুন্দরী পুত্রবধূর দিকে হুযুরের নেক নজরের ব্যাপারটাও তার দৃষ্টিগোচর হলো।
এমদাদ হুযুরের ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচনের সুযোগ খুঁজতে লাগল। ষড়যন্ত্রমূলক মোরাকেবা থেকে যখন সুকৌশলে পীর সাহেব রজবের স্ত্রী কলিমনকে নিজের জন্য হালাল করে নিলেন যখন প্রতিবাদী এমদাদ আর চুপ করে থাকতে পারল না।
কলিমনের ঘন ঘন মূর্ছার মধ্যদিয়ে যখন পীর সাহেবের সাথে বিয়ে পড়ানো হচ্ছিল 'তখন এমদাদ এক লাফে বরাসনে উপবিষ্ট পীর সাহেবর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। হুযুরের মেহেদিরঞ্জিত দাঁড়িতে হেচকা টান মেরে সে সক্রোধে বলে উঠল- "রে ভণ্ড শয়তান, নিজের পাপবাসনা পূর্ণ করিবার জন্য দুটা তরুণ প্রাণ দুঃখময় করিয়া দিতে তোর বুকে বাজিল না?”
সকলে মার মার শব্দে এমদাদের উপর আক্রমণ চালালে সে বলল "তোমরা নিতান্ত মূর্খ। এই ভঙের চালাকি বুঝিতে পারিতেছ না। নিজের সখ মিটাইবার জন্য সে হযরত পয়গম্বর সাহেবকে নিয়ে তামাশা করে তাঁর অপমান করিতেছে। তোমরা এই শয়তানকে পুলিশে দাও।" কিন্তু কেউ এমদাদের কথায় কান দিল না। প্রতিবাদী এমদাদকে মারতে মারতে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেয়া হলো।
মন্তব্য: উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, এমদাদ আধুনিককালের এক প্রগতিশীল প্রতিবাদী যুবক। ধর্মের নামে ভণ্ডামি ও প্রতারণা করে পীর সাহেব যে কু-ইচ্ছা পূরণে ষড়যন্ত্র করেছিল মুরিদেরা তা বুঝতে না পারলেও এমদাদের কাছে তা ধরা পড়েছিল। একা হলেও এমদাদ এর প্রতিবাদ করেছে- প্রতিবাদ করতে গিয়ে সে মার খেলেও অন্যায়কে বিনা প্রতিবাদে মেনে নেয়নি। এমদাদ চরিত্রের বৈশিষ্ট্য এখানেই।
প্রশ্না৫। 'হুযুর কেবলা' গল্পের পীর সাহেব চরিত্রের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।
উত্তর: আবুল মনসুর আহমদ বিরচিত 'হুযুর কেবলা' গল্পের মুখ্য চরিত্র এক তথাকথিত ভণ্ড পীর এবং এক প্রতিবাদী যুবক এমদাদকে আশ্রয় করে গল্পকার গল্পের কাহিনি নির্মাণ করেছেন। এর কাহিনিতে পীর সাহেবের ভণ্ডামির চিত্র জ্বলন্ত হয়ে ফুটে উঠেছে। নিম্নে তার সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো:
হুযুর কেবলা বা পীরের সংক্ষিপ্ত পরিচয়: 'হুযুর কেবলা' গল্পের পীর সাহেবের বিস্তারিত নাম পরিচয় লেখক নির্দিষ্টভাবে তুলে ধরেননি। বর্ণনা মতে জানা যায় তাঁর ছিল একতলা পাকাবাড়ি। বাড়িটি বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। অন্দরমহলের সব ক'খানা ঘরই পাকা।
তাঁর বৈঠকখানাটি একটা প্রকাণ্ড খড়ের তৈরি আটচালা ঘর। তিনি বয়সে প্রবীণ। তাঁর মুখভর্তি মেহেদি রঞ্জিত দাড়ি। ঘরের মেঝেতে মুরিদেরা হুযুরের সামনে হাঁটু ভেঙে বসে তাঁর কথা শোনে। মুরিদদের কাছে তিনি কামেল পীর হিসেবে বিবেচ্য। নিজের স্বার্থ উদ্ধারের ব্যাপারে তিনি যে কোন ধরনের প্রতারণার আশ্রয় নিতে কুণ্ঠিত হতেন না।
তাঁর কয়েকজন বিশ্বস্ত মুরিদ ছিল, যারা তাঁর সব ধরনের প্রতারণার কাজে অন্ধভাবে সহযোগিতা করতো। পীর সাহেব প্রতারণামূলক কেরামতি প্রদর্শন করে গ্রামের অজ্ঞ মুরিদদেরকে তাক লাগিয়ে তাদের ভক্তিশ্রদ্ধা আদায় করতেন। হুযুর কেবলা ছিলেন একজন ভোজনরসিক মানুষ। নানান ধরনের খাবার খেতে তিনি পছন্দ করতেন।
দূরবর্তী স্থানে মুরিদানে যাওয়ার সময় পথের খাদ্যের প্রয়োজনে তাঁর বজরায় এক মন ঘি, আড়াই মন তেল, দশ মন সরু চাল, তিন শত মুরগি, সাত সের অম্বুরি তামাকসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য তোলা হয়েছিল। মুরিদানে পৌঁছানোর পর বিভিন্ন মুরিদের বাড়িতে পীর সাহেবের উদ্দেশ্যে বিশাল বিশাল ভোজের আয়োজন হলো।
সফরসঙ্গী এমদাদ পীর সাহেবের খাওয়ার নমুনা দেখে বুঝতে পারল পীর সাহেবের রুহানি শক্তি যত বেশিই থাকুক না কেন, তাঁর হজমশক্তি নিশ্চয়ই তার চেয়ে অনেক বেশি। পীর সাহেব ছিলেন এক নারী লোভী ভণ্ড শয়তান। মহিলা মুরিদদের প্রতি তাঁর ছিল মাত্রাতিরিক্ত নেকনজর।
মেয়েদের ধর্মকথা বুঝাতে তিনি বেশি রকম আগ্রহী ছিলেন। তাই পুরুষদের মজলিসের চেয়ে তিনি মহিলাদের ওয়াজে বেশি সময় কাটাতেন। মুরিদের পুত্রবধূ (রজবের স্ত্রী) কলিমন ছিল অপূর্ব সুন্দরী। পীর সাহেব কলিমনকে বিয়ে করার লক্ষ্যে এক চতুর পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।
তিনি কৌশলে মোরাকাবা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সেখান থেকে তাঁর জন্য কলিমনকে হালাল করে নেন। এ ক্ষেত্রে তিনি মহানবীর আত্মার সাথে তামাশা করতেও দ্বিধা করেননি। বিবেক, বুদ্ধি, মানবতা সমস্ত কিছুকে বিসর্জন দিয়ে পীর সাহেব তাঁর নারী লোলুপতাকে চরিতার্থ করেছেন।
কলিমনের আর্তনাদ রজবের বুকফাটা কান্না কোন কিছুকেই তিনি পরোয়া করেননি। নিজের কামবাসনা চরিতার্থ করতে তিনি ধর্ম, রাসূল, কেতাব প্রভৃতিকে ব্যবহার করেছেন। তাঁর এ নারী আসক্তি তাঁকে বিবেকবর্জিত অমানুষে পরিণত করেছিল।
মন্তব্য: উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, দুশ্চরিত্র, লম্পট, ভণ্ড, প্রতারক, মোনাফেক এমন কোন বিশ্লেষণ নেই যা 'হুযুর কেবলা' গল্পের পীর সাহেবের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় না। মানুষ নামের এ পশুটি ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষের বিশ্বাসের সাথে প্রতারণা করেছেন। এ কারণে তিনি মানুষ নামের কলঙ্ক। তাঁকে আমরা সবাই ঘৃণা করি।
প্রশ্ন: ৬ | 'হুযুর কেবলা' গল্পের ভোজনরসিক পীর সাহেবের খাদ্যগ্রহণের বর্ণনা দাও।
উত্তরা: আবুল মনসুর আহমদ বিরচিত 'হুযুর কেবলা' গল্পের মুখ্য চরিত্র এক তথাকথিত ভণ্ড পীর- সে শুধু ভণ্ডামিতেই শ্রেষ্ঠ নয়- খাবার ব্যাপারের দারুণ ভোজনপটু।
ভোজনরসিক পীর সাহেব হুযুর কেবলা ছিলেন একজন ভোজনরসিক মানুষ। নানান ধরনের খাবার খেতে তিনি পছন্দ করতেন। দূরবর্তী স্থানে মুরিদানে যাওয়ার সময় পথের খাদ্যের প্রয়োজনে তাঁর বজরায় এক মন ঘি, আড়াই মন তেল, দশ মন সরু চাল, তিন শত মুরগি, সাত সের অম্বুরি তামাকসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য তোলা হয়েছিল।
মুরিদানে পৌঁছানোর পর বিভিন্ন মুরিদের বাড়িতে পীর সাহেবের দ্দেশ্যে বিশাল বিশাল ভোজের আয়োজন হলো। সফরসঙ্গী এমদাদ পীর সাহেবের খাওয়ার নমুনা দেখে বুঝতে পারল পীর সাহেবের রুহানি শক্তি যত বেশিই থাকুক না কেন, তাঁর হজমশক্তি নিশ্চয়ই তার চেয়ে অনেক বেশি। তিনি এভাবেই তাঁর রসনাকে চরিতার্থ করতেন।
আরো পড়ুন: পথ জানা নেই গল্পের মূলভাব এবং রচয়িতা কে
মন্তব্য: সুতরাং আমরা বলতে পারি যে, 'হুযুর কেবলা' গল্পের হুযুর বা পীর সাহেব অন্যান্যদের থেকে যে বেশি পরিমাণে খাদ্য গ্রহণ করতো তা লেখক তাঁর পাঠকের সামনে উন্মোচন করে কেবলা হুযুরের ভোজনপটু বৈশিষ্ট্যকে প্রতিকায়িত করেছেন।
প্রশ্ন: ৭ 'ভয়র কেবলা' গল্পের হুযুর কেবলার নারী আসক্তির পরিচয় দাও।
উত্তরঃ আবুল মনসুর আহমদ বিরচিত 'হুযুর কেবলা' গল্পের মুখ্যচরিত্র এক তথাকথিত ভণ্ড পীর- ভণ্ড ধর্মব্যবসায়ী। নিজের অর্থসিদ্ধির জন্য তিনি এমন কোন ভণ্ডামি নেই যা করতে পারতেন না। কয়েকজন বিশ্বস্ত সহযোগীর মাধ্যমে তিনি মানুষের সাথে প্রতারণা করতেন- এমনকি নারীদের প্রতি ছিল তার কামনার লোলুপ-দৃষ্টি।
পীর সাহেবের নারী আসক্তি: পীর সাহের ছিলেন এক নারী লোভী ভণ্ড শয়তান। মহিলা মুরিদদের প্রতি তাঁর ছিল মাত্রাতিরিক্ত নেকনজর। মেয়েদের ধর্মকথা বুঝাতে তিনি বেশি রকম আগ্রহী ছিলেন। তাই পুরুষদের মজলিসের চেয়ে তিনি মহিলাদের ওয়াজে বেশি সময় কাটাতেন।
মুরিদের পুত্রবধূ (রজরের স্ত্রী) কলিমন ছিল অপূর্ব সুন্দরী। পীর সাহেব কলিমনকে বিয়ে করার লক্ষ্যে এক চতুর পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তিনি কৌশলে মোরাকাধা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সেখান থেকে তাঁর জন্য অলিমনকে হালাল করে নেন।
এ ক্ষেত্রে তিনি মহানবীর আত্মার সাথে তামাশা করতেও দ্বিধা করেননি। বিবেক, বুদ্ধি, মানবতা সমস্ত কিছুকে বিসর্জন দিয়ে পীর সাহেব তাঁর নারী লোলুপতাকে চরিতার্থ করেছেন। কলিমনের আর্তনাদ রজবের বুকফাটা কান্না কোন কিছুকেই তিনি পরোয়া করেননি। নিজের কামবাসনা চরিতার্থ করতে তিনি ধর্ম, রাসূল, কেতাব প্রভৃতিকে ব্যবহার করেছেন। তাঁর এ নারী আসক্তি তাঁকে বিবেকবর্জিত অমানুষে পরিণত করেছিল।
মন্তব্য: সুতরাং আমরা বলতে পারি যে, 'হুযুর কেবলা' গল্পের হুযুর বা পীর সাহেব স্বীয় কামলোলুপতা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে ধর্মকে স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে অনৈতিক পথে ব্যবহার করে। মুরিদদের ঠকিয়ে পীর, সাহেব কলিমনকে বিয়ে করতে সক্ষম হয়েছিলেন। চতুর পীর সাহেব এভাবেই অপকৌশল প্রয়োগ করে নিজের কামনা-বাসনা পূর্ণ করতেন।
প্রশ্ন: ৮ 'হুযুর কেবলা' গল্পের গল্পকার কীভাবে হুযুর কেবলা ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচন করেছেন।
উত্তর: 'হুযুর কেবলা' গল্পটি স্বনামধন্য গল্পকার আবুল মনসুর আহমদ বিরচিত 'আয়না' গল্পগ্রন্থের অন্তর্গত। গল্পটি একটি সামাজিক গল্প। এ গল্পে গল্পকার একদিকে যেমন সমাজের ধর্মব্যবসায়ীদের ভণ্ডামির মুখোশ খুলে দিয়েছেন তেমনি অন্যদিকে বাঙালি মুসলমান সমাজের মধ্যকার অন্ধত্ব, গোঁড়ামি ও কুসংস্কাকেও তুলে ধরেছেন।
ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচন: 'হুযুর কেবলা' গল্পের পীর সাহেব বয়সে বৃদ্ধ। বর্ণনা মতে তাঁর তিন-স্ত্রী বর্তমান। তিনি মুরিদদের বুজরুকির মাধ্যমে মোহাবিষ্ট করে রাখেন। সহজসরল মুরিদেরা হুযুর যা বলেন তা অকপটে বিশ্বাস করে। পীর সাহেবের নারীদের প্রতি বিশেষ দুর্বলতা ছিল। মুরিদানে গিয়ে তিনি পুরুষদের মজলিসের চেয়ে মেয়েদের ওয়াজের আসর বেশি পছন্দ করতেন।
মেয়েদের মজলিসে বসে ওয়াজ করতে করতে তাঁর প্রায়ই জযবা আসত। এটা ছিল পীর সাহেবের ফাজলামি। এ সময় মুরিদেরা তাঁর হাত পা টিপে দিলে তিনি সুস্থ হতেন। মেয়েমহলে ওয়াজের সময় পীর সাহেবের নজর পড়ে বাড়িওয়ালার পুত্র রজবের সুন্দরী স্ত্রী কলিমনের উপর।
পীরসাহেব স্থির করেন কলিমনকে নিজের জন্য হালাল করবেন। এ কু-ইচ্ছা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে তিনি তাঁর দুই খলিফার সাথে গোপনে পরামর্শ করে এক 'মোরাকেবা' অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। সুফি সাহেবের অচেতন (?) দেহে হুযুর রাসূলের আত্মাকে আনার কথা বলে তাঁকে দিয়ে কলিমনকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন।
উপস্থিত সকলেই এ ঘটনা বিশ্বাস করে প্রস্তাব সমর্থন করে। রজব তার স্ত্রীকে তালাক দিতে বাধ্য হয়। সকলের সহযোগিতা ও সমর্থনে কলিমনের সাথে পীর সাহেবের বিয়ে হয়ে যায়। গল্পকার পীর সাহেবের ভণ্ডামি ও প্রতারণার চিত্রটি সুন্দরভাবে এ গল্পে উপস্থাপন করেছেন।
এ গল্পের মাধ্যমে আমাদের দেশের ধর্মব্যবসায়ীদের ভণ্ডামির মুখোশ সুন্দরভাবে উন্মোচিত হয়েছে। লেখক প্রহসনের মেজাজে ধর্মীয় ভণ্ডামিকে তীব্র কটাক্ষবাণে জর্জরিত করেছেন।
মন্তব্য: আবুল মনসুর আহমদের, 'হুযুর কেবলা' গল্পের মূল প্রতিপাদ্য কেবল ভণ্ড ধর্মব্যবসায়ীদের মুখোশ উন্মোচন নয়, বাঙালি মুসলমান সমাজের অন্ধত্ব ও কুসংস্কার নির্দেশ করাও- কথাটি সর্বৈব সত্য। লেখক অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ধর্মব্যবসায়ীদের ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচন করেছেন। পাশাপাশি তিনি আমাদের সমাজদেহে বিরাজমান অন্ধত্ব ও কুসংস্কারকে চিহ্নিত করেছেন।
লেখকের মন্তব্য
হুযুর কেবলা গল্পের খ বিভাগের জন্য কিছু সংক্ষিপ্ত প্রশ্নের উত্তর তুলে ধরেছি। আপনাদের যাদের বই নেই আপনারা এখান থেকে এগুলো দেখে নিতে পারেন। আর্টিকেলটি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুবান্ধবদেরকে সঙ্গে শেয়ার করুন অথবা আপনার facebook আইডিতে শেয়ার করে দিন। এরকম আরো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেতে আমাদের সঙ্গেই থাকুন ধন্যবাদ।



ইভিভিটিভি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়;
comment url