নয়নচারা গল্পের মূলভাব সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্

আপনি কি নয়ন ছাড়া গল্পের মূলভাব এবং লেখক এর পরিচিতি সম্পর্কে জানতে চান? এ পুরো আর্টিকেলে আমরা নয়নচারা গল্পের মূলভাব লেখকের পরিচিতি এবং আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এবং প্রশ্নের উত্তর তুলে ধরেছি। আপনি যদি নয়নচারা গল্প সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান তাহলে এই আর্টিকেলটি আপনার জন্য। এবং নয়ন ছাড়া গল্পের আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে।
নয়নচারা-গল্পের-মূলভাব-সৈয়দ-ওয়ালীউল্লাহ্
আমি নয়ন ছাড়া গল্পটি সহজ ভাবে ব্যাখ্যা করেছি। তোমরা এই মূলভাবটা পড়লে সহজে বুঝতে পারবে।

লেখক পরিচিতি

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপকার। জীবন-সন্ধানী ও সমাজসচেতন এ সাহিত্য-শিল্পী চট্টগ্রাম জেলার ষোলশহরে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতৃনিবাস ছিল নোয়াখালীতে। তাঁর পিতা সৈয়দ আহমদউল্লাহ ছিলেন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে পিতার কর্মস্থলে ওয়ালীউল্লাহর শৈশব, কৈশোর ও যৌবন অতিবাহিত হয়। ফলে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনকে নানাভাবে দেখার সুযোগ ঘটে তাঁর, যা তাঁর উপন্যাস ও নাটকের চরিত্র-চিত্রণে প্রভূত সাহায্য করে।

অল্প বয়সে মাতৃহীন হওয়া সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে আইএ এবং ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। তারপর কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে এমএ পড়ার জন্য ভর্তি হন।

কিন্তু ডিগ্রি নেওয়ার আগেই ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর পিতার মৃত্যু হলে তিনি বিখ্যাত ইংরেজি দৈনিক 'দি স্টেটসম্যান'-এর সাব-এডিটর নিযুক্ত হন এবং সাংবাদিকতার সূত্রে কলকাতার সাহিত্যিক মহলে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তখন থেকেই বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর রচনা প্রকাশিত হতে থাকে। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান হওয়ার পর তিনি ঢাকায় এসে ঢাকা বেতার কেন্দ্রে সহকারী বার্তা সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে করাচি বেতার কেন্দ্রের বার্তা সম্পাদক নিযুক্ত হন।

এরপর তিনি কূটনৈতিক দায়িত্বে নয়াদিল্লি, ঢাকা, সিডনি, করাচি, জাকার্তা, বন, লন্ডন এবং প্যারিসে নানা গদে নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর সর্বশেষ কর্মস্থল ছিল প্যারিস। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করার জন্য তিনি পাকিস্তান সরকারের চাকরি থেকে অব্যাহতি নেন এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ব্যাপকভাবে সক্রিয় হন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পূর্বেই ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ১০ অক্টোবরে তিনি প্যারিসে মৃত্যুবরণ করেন।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সাহিত্যকর্ম সমগ্র বাংলা সাহিত্যে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। ব্যক্তি ও সমাজের ভেতর ও বাইরের সূক্ষ্ম ও গভীর রহস্য উদ্‌ঘাটনের বিরল কৃতিত্ব তাঁর। তাঁর গল্প ও উপন্যাসে একদিকে যেমন স্থান পেয়েছে কুসংস্কার ও অন্ধ-ধর্মবিশ্বাসে আচ্ছন্ন, বিপর্যস্ত, আশাহীন ও মৃতপ্রায় সমাজজীবন, অন্যদিকে তেমনি স্থান পেয়েছে মানুষের মনের ভেতরকার লোভ, প্রতারণা, ভীতি, ঈর্ষা প্রভৃতি প্রবৃত্তির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। কেবল রসপূর্ণ কাহিনি পরিবেশন নয়, তাঁর অভীষ্ট ছিল মানবজীবনের মৌলিক সমস্যার রহস্য উন্মোচন।

তাঁর গল্পে মানুষের আত্মিক অন্ধকার ও জটিলতা অত্যন্ত ব্যঞ্জনাধর্মী ও বলিষ্ঠ বক্তব্যে উদঘাটিত হয়েছে। 'নয়নচারা' (১৯৪৬) এবং 'দুই তীর ও অন্যান্য গল্প' (১৯৬৫) তাঁর গল্পগ্রন্থ এবং 'লালসালু' (১৯৪৮) 'চাঁদের অমাবস্যা' (১৯৬৪) ও কাঁদো নদী কাঁদো' (১৯৬৮) তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ নিরীক্ষামূলক চারটি নাটকও লিখেছেন। সেগুলো হলো: 'বহিপীর', 'তরঙ্গভঙ্গ', 'উজানে মৃত্যু' ও 'সুড়ঙ্গ'।

গল্পের মূলভাব: নয়নচারা

'নয়নচারা' সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর একটি জীবনমুখী সামাজিক গল্প। গল্পটিতে কাহিনি বলতে তেমন কিছু না থাকলেও এটি গভীর বক্তব্যে পরিপূর্ণ। দুর্ভিক্ষতাড়িত একদল মানুষের প্রতিনিধি আমুকে আশ্রয় করে সেই বক্তব্য উপস্থাপিত হয়েছে। ময়ূরাক্ষী নদীতীরবর্তী নয়নচারা নামের গ্রামটি বন্যার পানিতে ভেসে গিয়েছে।

সেখানকার বানভাসি মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়ার পর বাঁচার তাগিদে শহরে এসে ভিড় করেছে। কিন্তু কে তাদের আশ্রয় দেবে? শহরের হৃদয়হীন মানুষ নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। এই বানভাসি মানুষগুলো তাদের কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত উপদ্রব ছাড়া কিছুই নয়। কোথাও আশ্রয় না পেয়ে অসহায় মানুষগুলো ফুটপাতে পড়ে আছে।

তাদের মাথার উপর আকাশের ছাদ। দুপুরের খাঁ খাঁ রোদ তাদের ক্ষুধার্ত শরীরকে তাঁতায় আর রাতের তারারা উঁকি ঝুঁকি মেরে তাদের সঙ্গে তামাসা করে। দিনের বেলা লঙ্গরখানা থেকে এদেরকে একবারের খাবার দেওয়া হয় বলে এরা এখনো মরেনি।

শহরের শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে অনভ্যস্ত মানুষেরা রাত জেগে হাঁপায় আর ভাবে শহরে এতো গরম কেন! কেন ময়ূরাক্ষীর শীতল হাওয়া এখানে নেই। এরা রাত জেগে জেগে ভাবে ময়ূরাক্ষীর কথা, ভাবে দিগন্ত জোড়া ধানক্ষেত আর রূপালি মাছের কথা। শহরের বুকে এদেরকে খুঁজে পাওয়া যায় না। লঙ্গরখানার একবেলার খাবারে এদের পেট ভরে না।

উদ্বাস্তু মানুষেরা তাই শহরের পথে পথে খাদ্যের সন্ধানে ঘোরে। শহরের রাস্তার দুই পাশে সারি সারি দোকান। ময়রার দোকানে মাছি ভোঁ ভোঁ করে। দোকানের মালিকের চোখে কোমলতা নেই আছে পাশবিক হিংস্রতা। এদের চোখে এমন হিংস্রতা যে মনে হয় চারদিকের অন্ধকারের মধ্যে দুটি ভয়ঙ্কর চোখ ধক ধক করে জ্বলছে। একটা মুদির দোকানে কয়েক কাঁদি পাকা কলা ঝুলছে।

কলাগুলোর রং হলুদ। সেদিকে তাকিয়ে ক্ষুধার্ত উদ্বাস্তুদের চোখ জুড়িয়ে যায়। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমু কলাগুলোর দিকে পলকহীন তাকিয়ে থাকে। আমুর মনে হয় ওগুলো কলা নয়- হলুদ রঙের স্বপ্ন। কলাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে মনে কেঁদে ওঠে আমু। আর ভাবে, কোথায় গো, কোথায় গো নয়নচারা গাঁ। নয়নচারা গ্রামের সাথে শহরের সামান্যতম মিল খুঁজে না পেয়ে এরা হতাশ হয়- ভয় পায়। ছিন্নমূল মানুষগুলো শহরে এসে একটা ব্যাপার দেখে বিস্মিত হয়।


এরা লক্ষ্য করে শহরের কুকুরগুলোর চোখে শত্রুতা নেই। কুকুরগুলো এদেরকে দেখে তেড়ে আসে না অথচ মানুষগুলো কেমন তেড়ে তেড়ে আসে। রাতের বেলা কুকুরেরা তাদের আশপাশেই অবস্থান করে। কিন্তু এরা শত্রুতা করে না। অথচ দিনের বেলায় আমুরা যে মানুষদের কাছে সাহায্যের জন্য হাত বাড়ায় তারা খ্যাঁক খ্যাঁক করে তেড়ে ওঠে। শহরের এ মানুষদের চোখ শত্রুতায় ভরা।

এমন শত্রুতা আমুরা দেখেছে গ্রামের কুকুরদের চোখে। এখানকার মানুষগুলোকে তাদের গ্রামের কুকুরদের অবস্থা দেখে আমু এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে বাধ্য হয় যে, গ্রামের কুকুর আর শহরের মানুষদের স্বভাব চরিত্র এক ও অভিন্ন। একদিন আমু ক্ষুধার্ত পেটে একটা খাবারের দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। দোকানের ভিতর থেকে বিভিন্ন রকম খাবারের সুগন্ধ ভেসে আসে তার নাকে।

দোকানি আমুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কুকুরের মতো তেড়ে আসে। আমুর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। সেও লোকটার উপর হিংস্রতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রচণ্ড মার খেয়ে আমু শহরের অচেনা রাস্তায় বেরিয়ে চলতে থাকে। অলি গলিতে ভরা এ রাস্তার যেন শেষ নেই। একবার আমু দার্শনিকের মতো মনে মনে ভাবে যে পথের শেষ নেই, সে পথে চলে লাভ কী?

চলতে চলতে ক্লান্ত শ্রান্ত আমু নিজেকে একটা বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়ানো দেখতে পায়। একটু পরে হঠাৎ খুলে যায় দরজাটা। মমতাময়ী এক গৃহবধূ বেরিয়ে এসে আমুকে কিছু খাবার দেয়। বিস্মিত আমু বধূটির মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবে এ কেমন মেয়ে? শহরের অন্যান্য মানুষের সাথে তো এর মিল নেই।

এই মেয়ের মায়ের বাড়ি নিশ্চয়ই নয়নচারা গাঁয়ে। 'নয়নচারা' ছোটগল্পের কাহিনিতে শহরের মানুষদের যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেয়েছে তা হৃদয়বিদারক। কাহিনিতে তাদের মনমানসিকতাকে কুকুরের চেয়েও হিংস্র বলে আমুর মনে হয়েছে। শহরে বসে সে যার কাছেই খাবারের জন্য হাত বাড়িয়েছে সেই তাকে কুকুরের মতো তাড়িয়ে দিয়েছে। সর্বগ্রাসী ক্ষুধা নিয়ে আমু মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছে।

কিন্তু কেউ তাদেরকে মানুষ বলে গণ্য করেনি। কেবল খেতে দেওয়া একটা মেয়েকে তার মানুষ বলে মনে হয়েছে এবং তার বদ্ধমূল ধারণা ওই মেয়েটির মায়ের বাড়ি নিশ্চয়ই নয়নচারা গাঁয়ে। গ্রাম ও শহরের মানুষের মধ্যে মন-মানসিকতার যে আকাশ পাতাল পার্থক্য তা এই গল্পের কাহিনিতে বাস্তবতার নিরিখে তুলে ধরা হয়েছে। শহরের মানুষের হৃদয়হীনতার নীচতাকে গল্পকার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন 'নয়নচারা' গল্পে।

গল্পকার হিসেবে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর পরিচয় দাও

উত্তর। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কলকাতার বিখ্যাত একটি দৈনিক পত্রিকায় তিনি কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। এরপর তিনি চাকরি করেছেন ঢাকা ও করাচির বেতারকেন্দ্রের বার্তা বিখ্যাত একটি দৈনিস্তান সরকারের বৈদেশিক বিভাগে যোগদান করেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্। কর্মসূত্রে নয়াদিল্লি, সিডনি, জাকার্তা ও লন্ডনে দায়িত্ব পালন শেষে তিনি আমৃত্যু প্যারিসে কর্মরত ছিলেন। সেখানে অবস্থানকালে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপকার। রূপকার। তিনি ছিলেন সমাজসচেতন সাহিত্য শিল্পী। জীবনসন্ধানী সমাজসচেতন এ শিল্পী ব্যক্তিজীবনেও সমাজ সমস্যাকে করেছেন তাঁর সৃজনকর্মের প্রধান উপকরণ ও উপজীব্য। তাঁর রচনায় উজ্জ্বলভাবে প্রতিফলিত হয়েছে ধর্মীয় ও সামাজিক কুসংস্কার, মূল্যবোধের অবক্ষয়, মানব মনের অন্তর্দ্বন্দ্ব প্রভৃতি।

বাংলাদেশের কথাসাহিত্যকে আন্তর্জাতিকমানে উন্নীত করার পথিকৃৎ তিনি। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস 'লালসালু' (১৯৪৮) ফরাসি ও ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়। এ উপন্যাসই তাঁকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করে তোলে। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে 'চাঁদের অমাবস্যা', 'কাঁদো নদী কাঁদো' প্রভৃতি উপন্যাস; 'নয়নচারা', 'দুই তীর', গল্পগ্রন্থ; 'বহিপীর', 'তরঙ্গভঙ্গ', 'সুড়ঙ্গ' প্রভৃতি নাটক। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ১০ অক্টোবর জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ প্যারিসে মৃত্যুবরণ করেন।

প্রশ্নঃ ২। 'নয়নচারা' গল্পের মূলভাব লিখ।

নয়নচারা-গল্পের-মূলভাব-সৈয়দ-ওয়ালীউল্লাহ্
উত্তর। ময়ূরাক্ষী নদীর তীরে নয়নচারা গ্রাম। গ্রামটি বন্যায় ভেসে গিয়েছে। বানভাসি মানুষেরা এসে আশ্রয় নিয়েছে শহরের ফুটপাতে। রাস্তার পাশে খোলা আকাশের নিচে এরা রাত কাটায়। সারাদিন শহরের অলিতে-গলিতে এরা মানুষের দুয়ারে দুয়ারে দু'মুঠো ভাতের জন্য ঘুরে বেড়ায়। শহরের হৃদয়হীন মানুষেরা এদেরকে দূর দূর করে তাড়ায়।

দুপুরে লঙ্গরখানা থেকে যে সামান্য দু'মুঠো ভাত এরা পায় তাতে পেট ভরে না। প্রচণ্ড ক্ষুধা নিয়ে তাই রাতের বেলায় শুয়ে শুয়ে কঁকায়। এ বানভাসি মানুষদের একজন আমু। আমুর অভিজ্ঞতাই 'নয়নচারা' গল্পে তুলে ধরা হয়েছে। ভুতনি, ভুতো প্রমুখের সাথে আমু শহরের দুঃসহ জীবন কাটায়।

খেতে না পেয়ে বিনা চিকিৎসায় ভুতনির ভাই ভুতো মারা গেছে। এরাও যেন মরার প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে। আমু খাবারের আশায় শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে। দোকানে ঝুলানো হলুদ রঙের পাকা কলা দেখে তার লোভ জাগে। কিন্তু তা ছোঁয়ার অধিকার আমুর নেই।

তাই কলাগুলো হলুদ রঙের স্বপ্নই থেকে যায়। ময়রার দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় আমু। দোকানি তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কুকুরের মতো তেড়ে আসে। আমু ভয় পেয়ে সরে যায় সেখান থেকে। শহরের কুকুর দেখে সে বিস্মিত হয়। কুকুরগুলো শহরের মানুষদের মতো হিংস্র নয়। একদিন লাল শাড়ি পরা একটা সুন্দরী মেয়ে আমুকে দু'টো পয়সা দিয়ে চলে যায়।

তার মাথার ঘনচুল দেখে আমুর মনে হয় এ চুল নিশ্চয়ই নয়নচারা গ্রামের ঝিরার মাথার চুল। আর একদিন আমু ক্ষুধার্ত পেটে একটা খাবারের হোটেলের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ভিতর থেকে বিভিন্ন রকম খাদ্যের সুগন্ধ ভেসে আসে। কিন্তু দোকান থেকে একটা লোক বেরিয়ে এসে আমুর সাথে দুর্ব্যবহার করা মাত্র আমু তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

প্রচণ্ড মার খেয়ে রক্তাক্ত আমু শহরের অচেনা রাস্তা বেয়ে চলতে থাকে। এ রাস্তার যেন শেষ নেই। একবার ভাবে, যে পথের শেষ নেই সে পথে চলে লাভ কি? চলতে চলতে ক্লান্ত-শ্রান্ত আমু নিজেকে একটা বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়ানো দেখতে পায়। হঠাৎ খুলে যায় দরজাটা।

মমতাময়ী এক গৃহবধূ বেরিয়ে এসে আমুকে কিছু খাবার দেয়। বিস্মিত আমু বধূটির মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবে এ কেমন মেয়ে। শহরের অন্যান্য মানুষের সাথে এর তো কোন মিল নেই। এমন মেয়ের বাড়ি শহরে হতে পারে না। এর বাড়ি নিশ্চয়ই নয়নচারা গ্রামে। আমু মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে, "নয়নচারা গাঁয়ে কি মায়ের বাড়ি?" মেয়েটি কোন উত্তর না দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।

নয়নচারা গ্রামের বর্ণনা দাও

নয়নচারা-গল্পের-মূলভাব-সৈয়দ-ওয়ালীউল্লাহ্
উত্তর। ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর 'নয়নচারা' গল্পটি রচিত। গল্পের কেন্দ্রে অবস্থান করেছে নয়নচারা গ্রাম- যে গ্রামটি ছিল সাধারণ মানুষের আশ্রয়স্থল এমনকি খাদ্যের ও সহমর্মিতার উৎসভূমি।

'নয়নচারা' গ্রামের বর্ণনা: নয়নচারা একটি গ্রাম। ময়ূরাক্ষী নদীতীরবর্তী নয়নচারা নামের গ্রামটি বন্যার পানিতে ভেসে গিয়েছে।

এই গ্রামের আমু, ভুতো, ভুতনি দুর্ভিক্ষের শিকার হয়ে ক্ষুধার যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে গ্রাম থেকে শহরে আসে জীবিকার অন্বেষণে। সেখানকার বানভাসি মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়ার পর বাঁচার তাগিদে শহরে এসে ভিড় করেছে। আমুর চোখে শহরের এবং গ্রামের মানুষের মধ্যে একটি স্পষ্ট পার্থক্য ধরা পড়ে।

গ্রামে এবং শহরে উভয় জায়গায় তারা দেখা গেলেও তার নিচের পরিবেশ যেন বিচিত্র। নয়নচারা গ্রামে তারারা আকাশের শের নিচে ঢালা মাঠ, ভাঙা মাটি, ঘাস, শস্য এবং ময়ূরাক্ষী নদী বিদ্যমান। কিন্তু শহরে তারা ভরা আকাশের নিচে আছে হিংসা-বিদ্বেষ, নিষ্ঠুরতা এবং অসহ্য বৈরিতা।

তাছাড়া গ্রামের মানুষের অন্তর যেখানে আদর-ভালোবাসয় পূর্ণ- সেখানে শহরের মানুষের মন অমানবিকতায় পরিপূর্ণ। আমুর মতো আরো অনেকে খাদ্যের অন্বেষণে শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে চলেছে। তাদের অনন্ত ছোটাছুটি মৃত্যু ছাড়া থামে না। ফুটপাথের ধারে কেউ বেদনায় গোঙাচ্ছে, কেউ বা নিঃশব্দে ধুকছে।

এ থেকে পালিয়ে বাঁচার কোন রাস্তার সন্ধান তাদের জানা নেই। আমুর ধারণা সেও অন্যদের মতো মৃত্যুর সদর দরজায় এসে পৌছেছে। একদিন শহরের এক হোটেল মালিকের হাতে মার খেয়ে আমু হাঁটতে হাঁটতে মনের অজান্তে কোথায় চলে যায় বুঝতে পারে না। হঠাৎ সে নিজেকে আবিষ্কার করে একটা বদ্ধ দরজার সামনে। সহসা বদ্ধ দরজা খুলে যায়।

এক মমতাময়ী গৃহবধূ আমুকে কিছু খাবার দেয়। মেয়েটাকে দেখে আমুর খুব চেনা চেনা মনে হয়। এমন মধুর নম্র ব্যবহার সে শহরের কারও কাছ থেকে পায়নি। এ মেয়েটা ঠিক যেন তাদের নয়নচাঁরা গ্রামের মেয়েদের মতো। এর মধ্যে দয়া আছে, মায়া আছে, মমতা আছে। আমুর নিশ্চিত বিশ্বাস জাগে- এ নয়নচারা গ্রামেরই মেয়ে। এ-সময় প্রাণহীন দরজা খুলে একটি মেয়ে আমুকে ক্ষুধা নিবৃত্তির অন্ন জোগায়। আমু ত্রস্তভঙ্গিতে কাপড়ের প্রান্ত মেলে ধরে খাবারটুকু গ্রহণ করে এবং মেয়েটির কাছে জানতে চায়: "নয়নচারা গাঁয়ে কি মায়ের বাড়ি?

নিদারুণ কষ্টের মধ্যে একটি মেয়ে আমুকে দুটো পয়সা দিলে আমুর মনে হতো সে-মেয়েটি তাদের গ্রামের ঝিরা। কারণ তাদের গ্রামের মানুষ না হলে এমন দয়া তাকে করবে কেন? মূলত আমু শহরে এসে শহরেও মানুষের মধ্যে প্রত্যক্ষ করেছে অমানবিকতা এবং তাদের চোখেস্নেহ-মায়া-মমতার পরিবর্তে তাদের চোখে দেখেছে হিংস্রতা। তাই শহওে কেউ তাদের সাহায্যের জন্যে এগিয়ে এলেও তাদের কাছে মনে হয় তার বাড়ি নয়নচারা গ্রামে।
সার্বিক মন্তব্য: নয়নচারা গ্রাম ছিল আমুদের জীবনীশক্তি। দুর্ভিক্ষ-দীর্ণ নয়নচারাবাসী খাদ্যের সন্ধানে শহরে এলেও তাদের প্রত্যাশা প্রতিনিয়তই বিধ্বস্ত ও বিষণ্ণ হয়েছে। নাগরিক আয়োজনপূর্ণ রাতের শহর উজ্জ্বল কিন্তু উদ্বাস্তু মানুষের হৃদয় বেদনাক্লিষ্ট ও অপূর্ণ। তাই তারা নিরন্তর গ্রামাভিমুখী- তাদের স্মৃতিরবীণায় বারবার নয়নচারাই ভেসে উঠেছে সুখ-স্বপ্নের স্মৃতি হয়ে।

লেখকের মন্তব্য

নয়নচারা গল্পের মূলভাব নিয়ে আমরা এতোক্ষন আলোচনা করলাম। আপনার যদি এই মূলভাবটি ভালো লেগে থাকে তাহলে আপনি আপনার বন্ধু অতবা ক্লাসমেট এর সাথে শেয়ার করুন যাতে আপনার ক্লাসসেট অনলাইন থেকে সহজে পড়ে নিতে পারে। তবে এই এই আর্টিকেল সম্পর্কে আপনার যদি কোন প্রশ্ন থাকে তাহলে অবশ্যয় কমেন্ট করে জানাবেন অথাব আমাদের সাথে যোগাযোগ করবেন। আর অবশ্যয় আপনি আপানর মূল্যবান কমেন্ট করতে ভুলবে না। আপনি যদি এই রকম আরো পড়াশোনার বিষয় তথ্য জানতে চান বা নতুন কিছু জানতে চান তাহলে ইভিভিটিভি ভিজিট করুন।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

ইভিভিটিভি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়;

comment url